একটা প্রশ্নের উত্তর কয়েক দিন ধরে খুঁজছিলাম। আচ্ছা, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগী কিংবা তাদের স্বজনরা কেন বার বার নির্যাতিত হন? স্বভাবতই হাসপাতালের জরুরী বিভাগ একটি উত্তেজনাকর জায়গা। সব সময় রোগী, স্বজনদের চাপ থাকে। জীবন, মৃত্যুর খেলা চলে সরকারী হাসপাতালের জরুরী বিভাগে। রাস্ট্র, সমাজ কিংবা ব্যক্তি কোনো পর্যায় থেকেই আমরা সেই উত্তেজনা প্রশমিত করতে পারিনি। এটা ব্যর্থতাই বলা যায়।

স্বজনরা মৃত্যুর মুখোমুখি থাকা রোগীদের নিয়ে হাসপাতালের আউটডোরে যান। তারও আগে কিছু ঘটনা থাকে। যেমন, এক্সিডেন্ট, সংঘর্ষ কিংবা বড় ধরনের কোনো অঘটন। এসব মোকাবেলা করেই রোগী নিয়ে হাসপাতালের ডাক্তারের শরনাপন্ন হন স্বজনরা। রোগীর শাররীক অবস্থা নিয়ে তখন মনে নানা শঙ্কা, ভয়ও কাজ করে। সরকারী হাসপাতাল হিসেবে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আউট ডোর বলতে গেলে ২৪ ঘন্টাই এ ধরনের বাস্তবতার মুখোমুখি।


আমি এটা মানতে বাধ্য, হাসপাতালের অনেক লিমিটেশন রয়েছে। ডাক্তার, নার্স ও ওষধ সঙ্কট রয়েছে। এসবের মধ্যে চিকিৎসকরা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তবে প্রায় সময়ই জরুরী বিভাগের নানা ঘটনা বর্তমান ভার্চুয়াল মিডিয়ায় সয়লাব হয়। এর বেশিরভাগ ঘটনাই হচ্ছে অসৌজন্যতামুলক আচরন। এসব ঘটনা ওসমানী হাসপাতালে হরহামেশাই ঘটছে। এ নিয়ে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে হাসপাতালের সংশ্লিষ্টরা (যেমন, ইণ্টার্ন ডাক্তার, নার্স ও ওয়ার্ড বয়) রীতিমত দাঙ্গয় জড়ান। দুনিয়ায় তো ভার্চুয়ালের পেছনে দৌড়ে, এ কারনে এখন সবকিছুই প্রকাশ্যে আসে।
যে বিষয়টি আমার মানতে কষ্ট হচ্ছে সেটি হচ্ছে ইণ্টার্ন ডাক্তারদের কর্মকাণ্ড। সবেমাত্র তারা শেষ বর্ষ সমাপ্ত করে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে দিনরাত কাজ করছেন। তাদের উপর চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রচণ্ড চাপ যে আছে সেটি মানি। এটা তো বাস্তবতা। সরকারী হাসপাতাল হিসেবে সে চিকিৎসা চাপের গণ্ডি আপনাদের পাড়ি দিতে হবে। এরপর তো আপনাদের সেবার দুনিয়ার দরোজা খোলে যাবে। কিন্তু যখন দেখি ইণ্টার্নরা রোগী স্বজন পেঠায়। নির্মমভাবে, নির্দয়ভাবে পেঠায়। যে হাতে চিকিৎসা সামগ্রী থাকার কথা সে হাতে যখন অস্ত্র দেখি তখন ভয় পাই। প্রশ্ন তো জাগেই- রাস্ট্রের টাকায় তাহলে তারা এতদিন কী পড়লেন?

এবার আসি সাংবাদিক পেঠানো প্রসঙ্গে। সিলেটের দু’জন সাংবাদিককে ইণ্টার্নরা নির্দয়ভাবে পিঠিয়েছে। কথাটি শোনার পর প্রথমে বিশ্বাস হচ্ছিল না। খবর নিয়ে জানলাম যে দু’জন সাংবাদিক পেঠানো হয়েছে তারা পেশাগত দায়িত্বে ছিলেন। ইন্টার্ণ ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে সংঘর্ষ চলছিলো তখন তারা ছবি সংগ্রহ করছিলেন। আর এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে সাংবাদিকদের উপর লোহার রড, স্যালাইন স্ট্যান্ড নিয়ে হামলা করা হয়।
প্রসঙ্গ এখানেই শেষ নয়, রোগীর স্বজন, সাংবাদিকদের নির্যাতনের মাধ্যমে যে ভুল করা হয়েছে সেটি ধামাচাপা দিতে উল্টো ধর্মঘট ডেকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জিম্মি করা হয়। ওই সময় কয়েকজন গুরুতর রোগী আউটডোরে ছিলেন। সব ফেলে দিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ইণ্টার্ন ডাক্তারদের কাজে ফেরাতে ব্যস্ত হন। শেষমেষ ইণ্টার্নদের কিছু দাবি মেনে নিয়েই তাদের কাজে ফেরানো হয়।
ওসমানী হাসপাতালের এই দৈন্যদশা আজকের নয়। অতীত থেকে এ দশা চলছে। সব সরকারের সময় হয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে এই ডাক্তার, নার্সরা শুধু যে ওসমানীতেই চাকুরী করেন তা না। তারা সিলেট নগরের বিভিন্ন বেসরকারী হাসপাতাল, ক্লিনিক সহ স্বাস্থসেবার নানান মাধ্যমেও সেবার কাজ করেন। বাস্তবতা হচ্ছে; সরকারী হাসপাতাল হিসেবে ওসমানীতে তাদের আচরন এক রকম আর বাইরের চিকিৎসালয়ে আরেক রকম। হাসপাতালের বাইরে তাদের পরিশিলিত আচরন অনেকটা অবাক করার মতো।

প্রশ্ন জাগতে পারে- তবে কেন ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এ ধরনের আচরন করেন তারা। একটি কথা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিংবা সরকারের তরফ থেকে বার বার বলা হচ্ছে হাসপাতাল ৯০০ শয্যা বিশিষ্ট। প্রতিদিন সেবা দেওয়া হয় দুই থেকে আড়াই হাজার রোগী। এই চাপ নিতে হিমশিম খাচ্ছেন সবাই। সে যুুক্তি তো গোটা বাংলাদেশের সরকারী হাসপাতালের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এটি কেবল ওসমানী হাসপাতালের ক্ষেত্রেই নয়। হাসপাতালে বর্তমান যে সাপোর্ট রয়েছে তারও কম সুবিধা নিয়ে অতীতে ডাক্তার, নার্স সহ সংশ্লিষ্টরা সেবা দিয়ে গেছেন। দুর্নীতি একটি বড় সমস্যা। সরকারী হাসপাতালে জবাবদিহীতার বিষয়টি গৌণ হয়ে যায়। সাংবাদিকরা তো বটে, অনেকেই বাইরে থেকে চোখ বুঝে বলতে পারেন কোথায় কী হচ্ছে?
সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভুমিকা মুখ্য। ব্যবস্থাপনার মানদণ্ড নিয়ে এখন প্রশ্নই উঠতে পারে। হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটি রয়েছে। এখানে রাজনৈতিক মতামত অগ্রাধিকার পায়। সুতরাং সরকারী হাসপাতালে ব্যবস্থাপনার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে কারনে রোগী স্বজন, সাংবাদিক পেঠানোর বিষয় নিয়ে ব্যবস্থাপকদের অব্যবস্থপনার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। এটা হওয়া স্বাভাবিক নয়। তাহলে কী জিম্মিদশায় থেকেই হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে বাধ্য করা হচ্ছে?
কয়েক মাস আগের কথা। ওসমানীতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আসবেন। রাত থেকেই কাজ আর কাজ। সব ধুয়েমুছে পরিস্কার করা হলো। স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে দেখানো হলো- সব ভালো আছে। কোনো সমস্যা নেই। রোগীদের সেবার কোনো কমতি ছিল না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আসার দিনের সেবা দেখে ভর্তি থাকা রোগীরাই প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। মন্ত্রীকে যা দেখানো হয়েছে, বাস্তব চিত্র যে তার ঠিক উল্টো ছিলো; এর প্রমান রোগীর স্বজন ও সাংবাদিক পেঠানোর ঘটনা। আর চাইলেই যে এক দিনের মতো ৩৬৫ দিন সেবা দেওয়া যায় সেটি তো স্বাস্থ্যমন্ত্রী আসার দিনই প্রমানিত হলো।

সাংবাদিক নির্যাতনের বিষয়টি পরিস্কার। এখানে ফৌজদারী কার্যবিধিতে অপরাধমুলক কর্মকাণ্ড। এর দায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারেন না। রোগীর স্বজনদের মারধোরের ঘটনাও একই ধরনের অপরাধ। এ অপরাধে যারাই জড়িত তারা দায় এড়াতে পারবেন না। রীতিমত গর্হিত কাজ। সাংবাদিকরা সমাজের অংশ। হাসপাতাল, রোগী, স্বজন কিংবা হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা একই ভাবে অংশীদার। ফৌজদারী অপরাধে যে কোনো সময় আইনের সহযোগিতা নেওয়া বাঞ্ছনীয়। এটা নেওয়ারই কথা। ভাবতে হয়, যেখানে জিম্মি রেখে রোগীর চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়, সেখানে কার বিরুদ্ধে আইনী লড়াইয়ে নামবেন। সেবকরা যখন হিংস্রতার পরিচয় দেন তখন কার কাছে গিয়ে বিচার চাইবেন? আর বিচার চাওয়াটাও কতখানি যৌক্তিক। যারা জিম্মি দশাতে বন্দি; তাদের জীবন নিয়ে তো ছিনিমিনি খেলা যায় না। রাস্ট্র, সমাজ কিংবা এ শিক্ষা কখনো দেয় না।


 

লেখক: ওয়েছ খছরু, ব্যুরো প্রধান, সিলেট অফিস, মানবজমিন।