পুরোনো দিনের কথা ভেবে ভেবে বেশ কয়েকটি ভ্রমণ করেছি। সিলেট থেকে সুনামগঞ্জ। আবার সিলেট থেকে মৌলভীবাজারেও গিয়েছি। বিভিন্ন উপজেলায় ঘুরেফিরে দেখেছি সেখানকার স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য আর কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো দালানকোঠা। কখনো শতবছরের পুরাতন, রাজা বা জমিদার বাড়ি। আবার কখনো শতবর্ষী মসজিদ। চলতি পথে কখনো বা যোগীসাধক মন্দির। আমাদের বেটুস পরিবারের আজিজুর রহিম খান মিজান, সানু উদ্দিন রুবেল, শাহ আলম রাফি ও আমি ইমরান ইমন। প্রতিনিয়ত নতুন কিছুর খুঁজে পথচলছি। অজানাকে জানতে ছুটির দিনে বেরিয়ে পড়া।

এমনই একটি জায়গা ছিল সুনামগঞ্জ শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত গৌরারং জমিদার বাড়ি। এটি উনবিংশ শতাব্দীর একটি সুবিশাল জমিদারবাড়ি। এখনো দেয়ালে লেগে আছে পুরোনো কীর্তির স্মৃতি। রঙবেরঙে আঁকা আলপনাসহ রয়েছে নানাবিধ কারুকার্য। বিস্তীর্ণ জায়গাজুড়ে পুরো বাড়ির অবস্থান। জানা যায়, প্রায় তিরিশ একর জায়গা জুড়ে পুরো জমিদার বাড়ি। রয়েছে আলাদা আলাদা ছয়টি ভবন। সেই ভবনগুলির নাম রংমহল, অন্দরমহল, সিংহাসন, জলসাঘর প্রভৃতি। জমিদার বাড়ির নারীদের যাতে গোসল ও প্রয়োজনীয় কাজ করতে অসুবিধে না হয় তাই বাড়ির সামনের সরু ফটকের পাশেই রয়েছে একটি বড়সড় দিঘী। অবশ্য সেখানে আলাদা আলাদা ঘাটে নারী পুরুষ উভয়েই গোসল সারতে পারতো বলে জানা যায়।
 


সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো জৌলুশ ম্লান হয়েছে। হারিয়েছে রূপ-লাবণ্য। জানা যায়, প্রায় একশ বছর আগে এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে জমিদার পরিবারের ছোট ভাইয়ের মৃত্যু হয় এবং বাড়ির একাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞে বাড়িটি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জমিদার পরিবারের মানুষজন চলে অন্যত্র। সেই থেকে ভঙ্গুর বাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। অযতনে অবহেলায় শ্রী হারিয়েছে বহুকাল আগে।
 

বাড়িটিতে ছড়িয়ে আছে কয়েকটি প্রাচীন ভবনের নিদর্শন। পুরা ইট সুরকির দেয়াল। ভবনের মধ্যে রংমহলের দেয়ালে আঁকা নারীর ছবি। লতাপাতার চিত্রকর্ম আজও অতীতের শিল্পরুচির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। রয়েছে রাজকীয় অন্দরমহল। গানবাজনা বা সাংস্কৃতিক আয়োজনের জন্যে রয়েছে জলসাঘর। সিংহাসন, অন্ধকূপ ও যাত্রামঞ্চের স্মৃতিচিহ্ন আরও বহমান। এখনো হাঁটতে হাঁটতে নিজের মনের কোণে নাড়া দেয় কিশোরীর ঘুঙুরের শব্দ। জলসা ঘর থেকে কানে আসে গানের স্বর। সবকটি ভবনের বাইরের দেয়ালে শ্যাওলা ধরেছে। আবার দেয়ালের গায়ে জন্মেছে অনামিকা বৃক্ষ। আমাদের জানান দেয় বাস্তবতার। কারও শুরু, আর কারও শেষ। তবে আজকাল প্রযুক্তির যুগেও ইট-সুরকির এমন মজবুত দেয়াল দেখা যায় না। অযত্নে আর প্রচুর অবহেলায় পড়ে আছে পুরো বাড়ির আঙিনা।

বারবার মনে পড়ছে, জমিদারবাড়িটি কেবল কিছু পুরোনো ইট-পাথর, রড ও সুরকির স্থাপনা নয়। এটি আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সময়ের পরিবর্তনের এক অমূল্য সম্পদের ভাণ্ডার। যেখানে লুকিয়ে আছে অতীতের সময়, ইতিহাস আর ঐতিহ্যের জমিদারদের গল্প। দেয়ালের ক্ষত, ভাঙা স্থাপনা আর নীরব প্রাঙ্গণজুড়ে লুকিয়ে আছে একসময়ের আভিজাত্য, মানুষের জীবন আর হারিয়ে যাওয়া দিনের দীর্ঘশ্বাস।

আছে কতশত, সহস্র মানুষের গল্প। হাসি, কান্না কিংবা আর্তনাদ। সব মিলিয়ে ইতিহাস। আছে কত মানুষের হৈ-হুল্লোড়। কান পাতলেই যেন শোনা যায়, জলসাঘর থেকে ভেসে আসছে নুপুরের ধ্বনি, গানের আসরের পুরোনো শ্লোক। বাস্তবে পুকুরের ঘাটে স্নান সেরে উঠে যায় এখনো কেউ কেউ। আমরা কাউকে দেখি। কাউকে দেখি না।

পুরোনো এসব কীর্তি বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন সরকারি বেসরকারি পদক্ষেপ। সেই সঙ্গে প্রয়োজন মানুষের মধ্যে জনসচেতনতা সৃষ্টি। অন্যথায় আমরা ইতিহাসের পাতা থেকে বহুদূরে চলে যাব। এখনই বিশেষ সুনজর না দিলে একসময় হয়তো এসব স্থাপনার ইট-সুরকিও দেখা যাবে না। বিরানভূমি হয়ে যাবে ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্ন। তখন এটিও হয়ে যাবে কোনো এক রূপকথার গল্প। মানুষ শুনবে। মনোযোগ দিবে না। কেউ বা তখন হেসে উঠবে।

পুরোদমে মুখস্থ করে পরীক্ষা দেয়া যায়। শত নম্বর পাওয়া যায় কিন্তু বইয়ের পাতা সব না। আর ইতিহাস কেবল বইয়ের পাতায় থাকে না। কখনো কখনো তা নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে কোনো পুরোনো বাড়ির ভাঙা দেয়ালের গায়ে। শ্যাওলা ধরা ইটে কিংবা পরিত্যক্ত কোনো আঙিনায়। পথের বাঁকে কোনো ঝোপঝাড়ে। গৌরারং জমিদারবাড়িও তেমনই এক ইতিহাস। যা আমাদের অতীতকে মনে করিয়ে দেয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্য সংরক্ষণের দায়বদ্ধতা তুলে ধরে। এরজন্যে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ইতিহাস পৌঁছে দিতে, শিক্ষার্থীদের ভ্রমণের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে ভ্রমণের প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে পাঠদান করাতে হবে। বছরে একবার আনন্দভ্রমণ বা বনভোজনের মাধ্যমে ক্ষান্ত হলে চলবে না। শিক্ষার্থীদের কাছে তুলে ধরতে হবে, বইয়ের পাতা মুখস্থ করে শিক্ষা অর্জন হয় না।
 

গৌরারং জমিদার বাড়ি ঘুরে বেটুস সদস্য সানু উদ্দিন রুবেল বলেন, আমাদের পুরাতন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলিকে বাঁচিয়ে রাখতে অবশ্যই উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। অন্যথায় আমাদের আর হারানোর কিছুই থাকবে না।
 


লেখক: ইমরান ইমন, এক্সিকিউটিভ অফিসার, দি সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি। প্রাক্তন সভাপতি, এমসি কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটি।