১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবসে নিজ ঘরে বাঁশের সাথে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন দক্ষিণ সুনামগঞ্জের পশ্চিম পাগালা ইউনিয়নের বাঘেরকোনা গ্রামের জুবেল আহমদ নামের ২০ বয়সের এক তরুণ। বিয়ে বাড়ি থেকে ফিরে নির্জন ঘরে ঢুকে তিনি আত্মহত্যা করেন। ওই তরুণের আত্মহত্যার কারণ কী হতে পারে জানে না পরিবার।
৫ ফেব্রুয়ারি একই উপজেলার জয়কলশ ইউনিয়নে ডুংরিয়া গ্রামে বিকাশ দাস (৪০) নামের এক যুবক গাছের সাথে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন। আত্মহননকারী বিকাশ মানসিক সমস্যা ছিলো বলে দাবি পরিবারের। ২ ফেব্রয়ারি শাল্লা উপজেলা পরিষদের বারন্দার গ্রিলে গলায় গামছা লাগিয়ে ফাঁস লাগানো অবস্থায় লাশ উদ্ধার করে অফিস সহায়ক সাদ্দাম হোসেন(২৫)। অফিস সহায়ক সাদ্দামের মৃত্যুতে অপমৃত্যু মামলা দায়ের করেছে পুলিশ।
মাস কিংবা সপ্তাহের কোনো না কোনো দিন এভাবেই সুনামগঞ্জ জেলায় ঘটছে আত্মহত্যা। মানসিক রোগ, পারিবারিক কলহ, মাদকাসক্তি, কর্ম সংস্থানের অভাব, দারিদ্রতা, ব্যাকারত্ব, প্রেমে হত্যশাসহ নানা কারণে হাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জ জেলার অনেক তরুণ-তরুণী বেঁচে নিচ্ছেন আত্মহত্যার মতো বিপজ্জনক পথ। গত এক বছরে সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আত্মহত্যায় অকাল মৃতু হয়েছে প্রায় ২০০ জনের। যাদের মধ্যে ২০-৪০ বছরের যুবক-যুবতীর সংখ্যাই বেশি।
পুলিশ সুপার কার্যালয় সুত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জের ১১ উপজেলায় গত এক বছরে গলা ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছেন ১৪৫ জন । বিষ পানে মৃত্যুবরণ করেছেন ৪৯ জন। আত্মহননকারী এসব লোকদের বয়স ২০-৪০ বছরের মধ্যে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পারিবারিক বিরোধ, প্রেমে ব্যর্তথা, মানসিক হতাশাই মূখ্য কারন বলে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। কোনো ধরণের অভিযোগ না পাওয়ায় এসব মৃত্যুর কারনে অপমৃত্যু মামলা দায়ের হয়েছে সংশ্লিষ্ট থানায়।
হতাশাগ্রস্ত হয়ে এভাবে দেশে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ আত্মহত্যা করছেন। গত দুই বছরে করোনা সংক্রমণ চলাকালে আত্মহত্যার এই প্রবণতা আরো বেড়েছে। একটি বেসরকারি সংস্থা আঁচলের গত মার্চের আত্মহত্যাবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারা দেশে করোনাকালে পুরুষের চেয়ে নারীরা বেশি আত্মহত্যা করেছে। ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের ফেব্রয়ারি পর্যন্ত মোট আত্মহত্যার ঘটনা ১৪ হাজার ৪৩৬টি। এর মধ্যে নারীর আত্মহত্যার ঘটনা ৮ হাজার ২২৮টি এবং পুরুষের আত্মহত্যার ঘটনা ৬ হাজার ২০৮টি। আত্মহত্যার ঘটনা পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ২০ থেকে ৩৫ বছর বয়সী রয়েছেন ৪৯ শতাংশ, ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী ৩৫ শতাংশ, ৩৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ১১ শতাংশ।
দেশের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সূচকে পিচিয়ে থাকা জেলা সুনামগঞ্জের জন্য আত্মহত্যার এমন পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ভবিষতে এর ধারা অব্যাহত থাকলে মানব সম্পদের বিপর্যয়ের সাথে সাথে সামাজিক অবক্ষয় আর পারিবারিক রক্ষণশীল সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন অনেকেই। আত্মহত্যার প্রতিরোধে যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষার হার বৃদ্ধিসহ পারিবারিক বিরোধ ধমনে তৃণমূল পর্যায়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির উপরে গুরত্ব দিয়েছেন তারা।
ইসলামগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক ও সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আবু সাইদ বলেন, হাওর অঞ্চলের তরুণদের বেশিভাগ কর্মসংস্থানের অভাবে বেকার। বেকারত্ব জীবন পারিবারিক বিরোধ ও হতাশার জন্ম দেয়। হতাশা থেকেই কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ বেঁচে নেয়। যা সমাজের বড় ধরনের একটি অবক্ষয়। এ থেকে পরিত্রান খোঁজা জরুরী।
অবসরপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. আব্দুল হাকিম বলেন, আত্মহত্যা মূলত হতাশাজনিত কারনে হয়ে থাকে। একটি মানুষ মরতে চায় যখন তার জীবনযাত্রা মানউন্নোয়নের কোনো লক্ষণ নেই। তার ভবিষ্যতের উন্নতির কোনো সোপন খোঁজে সে পাচ্ছে না অথবা পারিবারিক কলহ। এসব কিছুর মূলেই অভাব অনটন,হত্যাগ্রস্ত ,কর্মস্থানের অভাব। হতাশাগ্রস্ত যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থান যদি করা যায়, যুকদের কাজে কর্মে ব্যস্ত রাখা যায়, জীবনযাত্রার মানউন্নোয়ন করা যায়, যেসব কারনে তারা হতাশাগ্রস্থ সেগুলো যদি চিহ্নিত করে উপশম করা যায় তাহলেই আত্মহত্যার প্রবণতা কমবে। হাওর অঞ্চলে যুবকদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সরকারের উদ্যোগ নেয়ার পাশাপাশি আত্মহত্যা প্রতিরোধে ইউনিয়ন পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি, পুলিশ ও স্বাস্থ্যবিভাগের লোকদের মাধ্যমে জনসচেতনা বৃদ্ধির উপরে জোর দেয়ার তাগিদ এই বিশ্লেষকের।
পুলিশ সুপার মিজানুর রহামন বলেন, গত বছরে সুনামগঞ্জে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ১৪৫ ও বিষপানে ৪৯ জন আত্মহত্যা করেছেন। পারিবারিক বিরোধ, প্রেমে ব্যর্থসহ নানা কারনে হতাশাগ্রস্ত হয়ে এসব আত্মহত্যা সংঘটিত হয়েছে। বিট পুলিশিং এর মাধ্যমে পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে পুলিশ জনসচেতনা বৃদ্ধিতে কাজ করছে বলে জানান তিনি।
সিলেটভিউ২৪ডটকম / শহীদনূর / ডি.আর




