শহুরে যান্ত্রিক জীবনের অদৃশ্য দেয়াল ডিঙিয়ে মাঝে-মধ্যে ইচ্ছে হয় খোলা জায়গায় একটুখানি নির্মল নিঃশ্বাস নিতে। কিন্তু সিলেট নগরীতে সে সুযোগ কমই বলা যায়। একটু মুক্ত বাতাসের জন্য যেতে হয় নগর পেরিয়ে। কিন্তু সেটি সাপেক্ষিক, প্রয়োজন সময় ও সুযোগের।
জীবিকার তাড়নায় অহর্নিশ ছুটে চলা জীবনে সেই সুযোগ আর সময় সবার থাকে না। তবে এবার চাইলে নগরীর ব্যস্ততম এলাকা জিন্দাবাজারের পাশেই বুকভরে নেওয়া যাবে ঘাসভেজা নিঃশ্বাস। নাগরিক গৎবাঁধা জীবনকে পেছনে ফেলে কোনো এক বিকেল অথবা সন্ধ্যারাতকে রাঙানো যাবে ভিন্ন রঙে।
নগরীর জিন্দাবাজার পয়েন্ট থেকেই আনুমানিক দুই শ গজ দূরের মহল্লার নাম ‘জল্লারপাড়’। সেখানের ‘অদৃশ্য’ জল্লায় একসময় ছিলো ময়লা-আবর্জনার বিশাল স্তুপ। দখলে-দূষণে হারিয়ে যেতে বসেছিলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর নগরীর মধ্যখানে অবস্থিত প্রায় ১ শ কোটি টাকা মূল্যের এই জায়গা। গত বছরের জুনে সেই জায়গা উদ্ধার করে সেখানে স্বপ্নের উদ্যান গড়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে নির্মাণ করেছে সিলেট সিটি করপোরেশন।
পরিত্যক্ত সেই জল্লা উদ্ধার করে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ‘জল্লারপাড় ওয়াকওয়ে’। ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যের ওয়াকওয়েটিতে হেঁটে ক্লান্ত হলে বসার জন্য তৈরি করে রাখা হয়েছে ১৫টি বেঞ্চ। নানা রঙের সাজসজ্জায় সজ্জিত করা হয়েছে ওয়াকওয়েটি। নির্ধারিত ব্যঞ্চ ছাড়াও জলার উপর নির্মাণ করা হয়েছে খড়কুটোর ছাতা। এর নিচে বসে খাওয়া এবং সময় কাটানোর জন্য রাখা হয়েছে বাঁশের বেঞ্চ। নিরাপত্তার জন্য লাগানো হয়েছে সিসি ক্যামেরা।
এখনও আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়নি ‘জল্লারপাড় ওয়াকওয়ে’র। তবে উদ্বোধনের আগেই মানুষের অবসর কাটানোর প্রিয় জায়গা হয়ে উঠেছে এটি। গত প্রায় ২ সপ্তাহ ধরে বিকেল হলেই নাগরিক জীবনে একটুখানে অবকাশযাপনের উদ্দেশে সেখানে ভিড় করেন নগরবাসী- নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী। অনেকে আসেন পুরো পরিবার নিয়ে। আনন্দঘন কিছু সময় কাটিয়ে আবার সবাই ফেরেন আপন নীড়ে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সকাল ১০টায় উন্মুক্ত করা হয় ওয়াকওয়েটি। খোলা থাকে রাত ১০টা পর্যন্ত।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান সিলেটভিউ-কে বলেন, জল্লারপাড় ওয়াকওয়েটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণসহ কয়েকটি শর্তে লিজ দেওয়া হয়েছে। খুব শীঘ্রই এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করা হবে।
উল্লেখ্য, প্রায় ১ শ কোটি টাকা দামের পাঁচ একর জায়গাজুড়ে এই জল্লার অবস্থান। উদ্ধারকৃত পুরো জল্লায় উদ্যান গড়ার পরিকল্পনা করেছেন মেয়র আরিফ।
গত বছরের ২৩ জুন সকালে অভিযানের আগে জল্লারপারের জলাভূমিটি ওই এলাকার স্থায়ী ও প্রবীণ লোকজন সিটি করপোরেশনের ভূমি-সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের দেখিয়ে দেন। এরপর জরিপ করে পাঁচ একর জায়গা চিহ্নিত করা হয়। কিছুটা গোলাকার জল্লার জায়গায় খননযন্ত্র চালিয়ে বর্জ্য পরিষ্কার করা হয়। এরপর জল্লা–তীরবর্তী এলাকায় দখলের উদ্দেশ্যে যত্রতত্রভাবে লাগানো গাছপালা কেটে পরিচ্ছন্ন করা হয়।
ওই এলাকার কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি জানান, নগরীর ঠিক মধ্যবর্তী এই জায়গা ব্যবসায়িকভাবে মূল্যবান। চারদিকে আলিশান ভবনের মাঝখানে জায়গাটি যে জল্লার, সেটি তাঁরা ভাবতেও পারেননি। কারণ, চারদিকের ভবনমালিকেরা নিজ নিজ সীমানার বাইরে জল্লা দখল করে রেখেছিলেন।
তবে সিসিকের অভিযানে সেদিন প্রায় সবটুকুই উদ্ধার করা হয় জল্লার জায়গা।
সিসিক সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে জল্লারপাড়ের জল্লার পাশে ছড়া উদ্ধারের পর ২০১৭ সালে ‘ওয়াকওয়ে’ প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়। এই প্রকল্পে দখল ও দূষণ ঠেকিয়ে ৯০০ ফুট দীর্ঘ একটি হাঁটার পথ তৈরি হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সূত্র ধরে হারানো জল্লা খুঁজে বের করার বিষয়টি সামনে আসে। সাত বছরের মাথায় ওইদিন অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হয় সেই জল্লা। নগরীর কেন্দ্রস্থলের এই এলাকায় জমির শতকের মূল্য ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা। এ হিসাবে ৫০ একর জায়গার মূল্য ১০০ কোটি টাকার ওপরে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম / ডালিম




