সিলেটের ওসমানীনগরের নদী খেকোদের দাপটে জৌলুস হারিয়েছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী বারুনী মেলা । যে নদীকে ঘিরে একসময় অনুষ্ঠিত হতো বারুনী মেলা, আজ সেই নদীর অস্থিতও খুঁজে পাওয়া দুস্কর। তবে, ঐতিহ্য ধরে রাখতে মেলা অনুষ্ঠিত হলেও নেই আগের জৌলুস। বুধবার (৩০ মার্চ) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উপজেলার তাজপুর বাজারে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী বারুনী মেলা।

মেলায় গিয়ে দেখা যায়, নদী দখলের কারণে খোলা জায়গা না থাকায় বাজারের অলিগলিতে বসেছে মেলার দোকান। ফার্মেসি কিংবা মুদি দোকানের সমানেই পসরা সাজান বিক্রেতারা। ঐতিহ্যবাহী মেলা হওয়ায় বাজারের ব্যবসায়ীরাও এক দিনের জন্য মেলা আয়োজনের সুযোগ করে দেন।


বুধবার বারুনী মেলা উপলক্ষে ছোট ছোট গলিতে ছিলো উপচে পড়া ভিড়। সনাতন ধর্মালম্বীদের মেলা হলেও ধীরে ধীরে সর্বজনীন মেলায় পরিণত হয়েছে বারুনী মেলা। স্থান সংকুলান না হওয়ার কারণে মেলায় আসা দর্শনার্থীদেরও পড়তে হয় বিপাকে। অতীতে উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে বারুনী মেলায় আসা দর্শনার্থীদের পদভারে মুখরিত থাকতো কিন্তু এসব এখন অতীত।


জানা গেছে, বুড়ি-বরাক নদীকে কেন্দ্র করে শত বছর ধরে ওসমানীনগরে অনুষ্ঠিত হতো বারুনী মেলা। বর্তমানে বুড়ি-বরাক নদীর অস্থিত্বও নেই। নদীখেকোদের দাপট আর খননের অভাবে হারিয়েছে বুড়ি-বরাক নদীর অস্তিত্ব। নদী দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা আর আবর্জনার স্তুপ।


স্থানীয় প্রবীন কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, সনাতন ধর্মালম্বীরা প্রতি বছর দোল পূর্ণিমা তিথিতে শত বছর আগে বুড়ি-বরাক নদীতে পূণ্য স্নান করতেন। মহাভারতে বর্ণিত বুড়ি-বরাক নদী গঙ্গার সাথে যুক্ত। গঙ্গা নদী হচ্ছে পাপ মোচনকারী নদী। পুর্ণিমা তিথিতে গঙ্গার জোয়ারের পানি বুড়ি বরাক নদীতে এসে মিলিত হয়। সঙ্গত কারণেই যারা গঙ্গা নদীতে স্নান করতে অক্ষম তারা বুড়ি বরাক নদীতে পূণ্য স্নান করতেন। এই নদীর গোয়ালাবাজার, তাজপুর বাজার, বেগমপুর, লামা গাভুরটিকি পাঁচপীরের মোকাম, বুরুঙ্গা এলাকাসহ নানা মোহনায় হাজার হাজার মানুষ পূণ্য স্নান করতেন। তাদের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি যোগানের লক্ষ্যে মেলার শুরু হয়। আর তখন উপজেলার তাজপুর বাজারে সবচেয়ে বেশি লোক সমাগম ঘটতো। দক্ষিনে ঢাকা দক্ষিন মহাপ্রভূর মেলা আর তাজপুরের বারুনী মেলা হচ্ছে সিলেটের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী মেলা। বর্তমানে বুড়ি বরাক নদী ইতিহাস থেকে প্রায় হারিয়ে গেলেও ইতিহাসের পথ ধরে বারুনী মেলা এখনো অনুষ্ঠিত হয়। তবে আগে মেলা একটানা ৭দিন থাকলেও বর্তমানে তা সীমিত আকারে আয়োজিত হচ্ছে। যদিও আগের সেই জৌলুস হারিয়েছে বারুনী মেলা ।


সাংবাদিক উজ্জ্বল দাশ বলেন, আগে মেলের সময় বুড়ি-বরাক নদীতে নৌকা দিয়ে মুখরোচক মিষ্টিসহ নানা নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে আসতেন বিক্রেতারা। নানা রকম পন্য নিয়ে মেলায় পসরা সাজিয়ে রাখতেন বিক্রি করার জন্য। দখলদারের দখলে এখন বুড়ি-বরাক নদী হারিয়ে গেছে। ফলে মেলার স্থান না থাকায় যেখানে সেখানে বসছে মেলার দোকান।


মেলায় আসা বিক্রেতারা জানান, করোনার কারনে গত ২ বছর এই মেলা হয়নি। এবার আয়োজন করা হলেও মেলায় জায়গার অভাব থাকায় দোকান নিয়ে বসতে তাদের রীতিমত প্রতিযোগিতায় নামতে হয়েছে।


তাজপুর ইউনিয়নের নব নির্বাচিত চেয়ারম্যান অরুনোদয় পাল ঝলক বলেন, বুড়ি-বরাক নদী এখন প্রায় বিলিন। তাজপুরের বারুনী মেলা ঐতিহ্যবাহী মেলা। করোনার কারণে এই মেলা গত দুই বছর বন্ধ ছিলো। নদী দখল হওয়ায় বাজারের ব্যবসায়ীদের নিয়ে বারুনী মেলার জায়গার সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা চলছে। এলাকাবাসীর সহায়তায় বুড়ি-বরাক নদী দখলমুক্ত করে তাজপুরে ঐতিহ্যবাহী বারুনী মেলার আগের সেই জৌলুসে ফিরবে বলে আশা রাখছি।

সিলেটভিউ২৪ডটকম/পিডি