‘যেখানেই ছিলাম না কেন বা থাকি না কেন, সিলেট আমাকে খুব টানে। আমি আবার সিলেট যাব।’ ঠিক এভাবেই জীবনের শেষবারের মতো কথাগুলো সিলেটে এসে বলেছিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

ঠিক দেড় মাস (৪৫ দিন) পর সিলেটে আবার আসছেন তিনি, তবে প্রাণবন্ত শিশুসুলভ জীবনন্ত শরীরে নয়; আসবেন কফিনবন্দী, নিথর, নিষ্প্রাণ হয়ে।


৮৮ বছরের বর্ণাঢ্য জীবন পেরিয়ে না ফেরার দেশে সাবেক অর্থমন্ত্রী, সিলেট-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর এই কিংবদন্তি সদস্য।

শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ৫৬ মিনিটে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালেশেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের টানা দুইবারের এ অর্থমন্ত্রী।

করোনা আক্রান্ত হয়ে গত বছর শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। দুই বছর নিজ শহর সিলেটে জন্য মন উচাটন করছিল। পরে পরিবারের সিদ্ধান্তে বড় ছেলে শাহেদ মুহিতকে নিয়ে গেল মাসের ১৪ মার্চ  সন্ধ্যা বিমানযোগে সিলেট পৌঁছেন তিনি। সিলেটে এসেই সর্বস্থরের মানুষের ভালবাসায় সিক্ত হয়েছিলেন বরেণ্য অর্থনীতিবীদ আবুল মাল।

এদিন রাত ১০টার দিকে স্থানীয় সাংবাদিকদের তিনি জানিয়েছিলেন- সিলেট শহকে ঘুরে ঘুরে ভালো করে দেখতে চান। দেখতে চান শৈশব-কৈশরে কাটানো স্মৃতিময় সিলেটকে। যে শহর নিয়ে তিনি গর্ব করে বলতেন ‘আমি একান্ত সিলেটের মানুষ’।

১৫ মার্চ সন্ধ্যায় এই গুণীজনকে ‘গুণীশ্রেষ্ঠ সম্মাননা’ দেয় সিলেট সিটি করপোরেশন। সেখানে বক্তৃতাকালে তিনি বলেছিলেন, ‘এই শহরে আমার বেড়ে ওঠা। আমি গর্ববোধ করি এখানে জন্মে। এখান থেকে অনেক গুণীর জন্ম হবে। আজকে সিলেট নগরে আমি একজন অতিথি। এটা একটা গর্বের বিষয়। নিজের জন্মস্থানে নিজে এমন একটি সম্মান পাওয়া গর্বের। জন্মভূমির প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি।’

নগরীর কিনব্রিজ এলাকায় চাঁদনীঘাটে জীবনে শেষবার সেদিন মঞ্চে ওঠে নিজের নিজেকে নিয়ে গর্ববোধ করে বলেছিলেন, ‘আমি আমার জীবনকে নিয়ে গর্বিত। অনেকে হয়তো একে আত্মগরিমা বলবেন। কিন্তু এটা অন্যায় নয়। বরং এর জন্য নিজেকে গড়ে তুলতে হয়।’

জন্মস্থানের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘ছোটবেলার আনন্দময়, স্বাধীনতার দিনগুলো খুবই উপভোগ্য ছিল। সেইসব দিনের সুখকর স্মৃতির স্মরণে আজকে সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। সিলেটের পরিবেশেই আমার জন্ম।’

এই কীর্তিমানের মৃত্যুতে সিলেটজুড়ে শোকের ছাড়া নেমে এসেছে।

এক নজরে মুহিতের বর্ণাঢ্য জীবন :
১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি সিলেটের এক সম্ভান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেন আবুল মাল। মা সৈয়দা শাহার বানু চৌধুরী ও বাবা আবু আহমদ আবদুল হাফিজের ১৪ সন্তানের মধ্যে ছিলেন তৃতীয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন তাঁর ছোট ভাই।

১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে মুহিত সিলেটের এমসি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। পরের একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের কৃতিত্ব নেন। ছাত্রজীবনে সলিমুল্লাহ হল ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন। অংশ নেন ভাষা আন্দোলনেও।

বিদেশে চাকরিরত অবস্থায় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন শেষে ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমপিএ ডিগ্রি লাভ করেছিলেন।

১৯৫৬ সালে আবদুল মুহিত যোগ দিয়েছিলেন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে (সিএসপি)। এ সংস্থার কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব পদে ছিলেন মুহিত। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন। অর্থনৈতিক পরামর্শক হিসেবে ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তৎকালীন পাকিস্তান দূতাবাসে যোগদান দেন। ওয়াশিংটন দূতাবাসে কূটনীতিকের দায়িত্ব পালনের সময় মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের জুনে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করেন।

১৯৭১ সালে গঠিত অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়াশিংটন দূতাবাসে ইকনমিক কাউন্সেলর আর ওই সময়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন এবং যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে পরিকল্পনা কমিশনের সচিব হিসেবে নিযুক্ত হন। এছাড়া ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বহিঃসম্পদ বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮১ সালে সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে  ফোর্ড ফাউন্ডেশনের অর্থনীতি এবং উন্নয়ন বিভাগের একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন সংস্থার গুরু দায়িত্বেও ছিলেন এই গুণীজন।

১৯৮২-১৯৮৩ সালে এরশাদ সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা পরবর্তীতে বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসহ জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন।

মুহিত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের মনোনয়নে ২০০৮ সালে সিলেট-১ আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৯ জানুয়ারি ৬ তারিখে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে টানা ১০ বছর বাজেট উপস্থাপন করেছেন জাতীয় সংসদে। ২০১৮ সালে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহন করেন।

২০২১ সালের ২৫ জুলাই করোনায় আক্রান্ত হন। গত মার্চের শুরুতে আবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ছিলেন কিছুদিন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে ১৪ মার্চ সিলেট ঘুরে আসেন। এটিই ছিলো তাঁর জীবনের শেষ সিলেট সফর। ১৬ মার্চ তাকে সিলেট সিটি করপোরেশন ‘গুণীশ্রেষ্ঠ সম্মাননা’ দেয়। এছাড়াও ২০১৫ সালের ১৬ জুন সিলেট জেলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স তাঁর নামে নামকরণ করা হয়।


সিলেটভিউ২৪ডটকম / মাহি / ডি.আর