পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের এমপি ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, আমি সিলেটের ধোপাদিঘীরপাড় এলাকার ছেলে। ১৯২৯ সালে আমাদের বাড়ি তৈরি হয়। এই এলাকায় তখন খুব বেশি বাড়িঘর ছিলো না। এই এলাকায় ব্রিটিশ সরকার প্রথমে জেলখানা তৈরি করে।
শনিবার (১১ জুন) সিলেট নগরীর ধোপাদিঘীরপাড়ের নান্দনিক ওয়াকওয়ে উদ্বোধনকালে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিবারিক স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে বলেন, আমার বাবা তখন কলকাতায় থাকতেন। কিন্তু তাঁকে সিলেটে পাঠানো হয় মুসলিমলীগ করার জন্য। কলকাতায় বাবা তাঁর নানার বাড়িতে থাকতেন। কারণ- বাবার বয়স যখন ৬ মাস তখন তাঁর মা- মানে আমার দাদি মারা যান। এর জন্য আমার বাবা তার নানির সঙ্গে তাদের বাড়িতে থাকতেন। আমার বাবার নানা খুব সম্মানিত লোক ছিলেন। তাঁর নানার নাম ছিলো স্যার মৌলভী আবদুল করিম। তৎকালীন তাঁর বাসায় ভারতবর্ষের সকল বড় বড় রাজনীতিবীদ বসে আড্ডা দিতেন। আমার বাবা ইয়াং বয়সে এদের দ্বারা প্রভাবিত হন।
ড. এ কে আব্দুল মোমেন আরও বলেন, ১৯২০-২১ সালে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে আবার বাবার গান্ধীজি, শওকত আলী, মওলানা মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে বিএ পরীক্ষা বাদ দিয়ে আন্দোলনে যোগ দেন। তিনি বিএ পরীক্ষা বাদ দিয়ে আন্দোলন নিয়ে ব্যস্ত। আমার দাদা তখন আসাম সরকারের সিভিল সার্ভিসে ছিলেন। তিনি খুব রাগ করলেন। ছেলে বিএ পাশ করবে না, আন্দোলন করবে সেটি তিনি মেনে নিতে পারলেন না। তিনি কলকাতায় গেলেন। কলকাতায় গিয়ে খুব রাগ করে বাবাকে টেনেহিচড়ে নিয়ে আসলেন। এসময় আবার বাবার এক মামা ছিলেন রাজশাহী কলেজের অধ্যাপক। নাম হেকিম সাহেব। ওখানে নিয়ে গিয়ে রাজশাহী কলেজে বাবাকে ভর্তি করিয়ে বাবাকে বললেন- আগে বিএ পাশ, পরে রাজনীতি। বাবা বিএ পাস করলেন রাজশাহী কলেজ থেকে। পরে কলকাতা থেকে ল’ পাস করেন। পরে আলীগড় ইউনিভার্সিটি থেকেও ডিগ্রি নেন।
সিলেটে ভারত সরকারের অর্থায়নে ২৪ কোটি ২৮ লক্ষ ৪৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ৩টি বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রকল্পগুলো হচ্ছে- নগরীর ধোপাদীঘির তীর সংরক্ষণ, কাষ্টঘরে ৬ তলাবিশিষ্ট ক্লিনার কলোনি ও চারাদীঘিরপাড় মজলিস আমীন স্কুলের ৬ তলাবিশিষ্ট ভবন।
শনিবার (১১ জুন) দুপুরে সেগুলোর উদ্বোধন করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এমপি, ঢাকাস্থ ভারতীয় হাই কমিশনার বিক্রম কুমার দোরাইস্বামী ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ধোপাদিঘীর বর্ণনা দিতে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ধোপাদিঘী একসময় অনেক বিশাল ছিল। ছোট বেলায় তিনি ও তার ভাইয়েরা এই দিঘী থেকে কচুরিপানা তুলেছেন। ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়া প্রথম বাঙালি ব্রজেন দাস এই দিঘীতে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। অনেকবার প্রদর্শনীতে এসেছেন। অনেক প্রতিযোগিতা হতো এই দিঘীতে। দিঘিতে প্রচুর মাছও হতো। এখন ধোপাদিঘি ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। দিঘির অনেকাংশ দখল হয়ে গেছে। তবে আশার কথা হচ্ছে- এখন ওয়াকওয়ে হওয়ায় নতুন করে আর দখল হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই।
সিলেটে একসময় প্রচুর দিঘি ছিল উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, একসময় সিলেট শহরে চারাদিঘি, মাছুদিঘি, লালদিঘি ও সাগরদিঘিসহ অনেক দিঘি ছিল। এসব দিঘি ভরাট হয়ে গেছে। শহরে দিঘি থাকা প্রয়োজন। আমেরিকায় মানুষ পানি সংরক্ষণ করে, দিঘির পানি খায়। আমরা ডিপটিউবওয়েল বসিয়ে পানি খাই। এটা নিয়ে আমাদেরকে ভাবতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, ধোপাদিঘীর সৌন্দয্যবর্ধনসহ তিন প্রকল্পের যখন চুক্তি হয় তখন ভারতের আসাম ও মেঘালয়ের দুইজন মন্ত্রী ছিলেন যারা ছোটবেলায় এই দিঘিতে সাঁতার কেটেছেন। এখানে স্কুলে পড়েছেন। তারা এই প্রকল্প দেখে অভিভূত হয়েছেন। তৎকালীন ভারতীয় হাইকমিশনার হ্রর্ষবর্ধন শ্রীংলা ও তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের চেষ্টায় ভারত সরকার এই তিন প্রকল্পে ২৫ কোটি টাকা অর্থায়ন করে।
ধোপাদিঘি আশপাশ এলাকার অতীতের কথা স্মরণ করে ড. মোমেন বলেন, ‘কথিত আছে মোগল সম্রাট ধোপাদের ব্যবহারের জন্য এই দিঘিটি দিয়েছিলেন। যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকার সিলেটে একটি রাস্তা নির্মাণ করতে চায়। তখন আমাদের এক মামা আসামের মন্ত্রী ছিলেন। উনার ছোট ভাই ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার। তখন তারা ঠিক করলেন এই ধোপাদিঘিরপাড় হয়ে রাস্তা শিলং পর্যন্ত যাবে। সেই অনুযায়ী সিলেট-শিলং রাস্তা তৈরি হয়।
একসময় ধোপাদিঘী এলাকায় খুব বেশি বাসাবাড়ি ছিল না উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ১৯২৯ সালে ধোপাদিঘীরপাড়ে তারা বাড়ি করেন। যেটি এখন হাফিজ কমপ্লেক্স নামে পরিচিত।
সিলেট পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের জায়গা একটি উন্মুক্ত উদ্যান করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন বলেন, সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের স্বপ্ন ছিল এখান থেকে কারাগার সরিয়ে একটি উদ্যান করার। সেই অনুযায়ী ২০১০ সাল থেকে নতুন কারাগার নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এখন পুরনো কারাগারে কেউ থাকেন না। নতুন কারাগারেও অনেক সিট খালি আছে।
পুরনো কারাগারের সাথে অনেক ইতিহাস জড়িয়ে আছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে একজন মাত্র নারীর ফাঁসি হয়েছিল। করিমুন্নেছা নামের ওই নারীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছিল এই কারাগারে। এছাড়া বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের পর এখানে কারান্তরিণ রাখা হয়েছিল। তাই ঐতিহাসিক এই স্মারকগুলো সংরক্ষণ করে সাবেক অর্থমন্ত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়নে এখানে একটি উন্মুক্ত উদ্যান হওয়া প্রয়োজন।
মন্ত্রী বলেন, এ নিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলেছেন। তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, তিনি সাবেক অর্থমন্ত্রীকে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি ও প্রকল্প একনেকে পাশ করিয়েছিলেন। ব্রিটিশ সরকার তৎকালীন ভারতবর্ষের লোকজনকে ভয় দেখানোর জন্য শহরের ভেতরে এভাবে অপরিকল্পিত কারাগার নির্মাণ করেছিল বলেও মন্তব্য করেন মন্ত্রী।
ড. এ কে আব্দুল মোমেন জানান, মৃত্যুর আগে সিলেট সফরে এসেছিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ওই সময় সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে তাকে গুণীশ্রেষ্ঠ সম্মাননা দেয়া হয়। ওই সফরকালে সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী সিলেটের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নের ব্যাপারে সাবেক অর্থমন্ত্রীর সাথে কথা বলেন। তখন তিনি এ উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি চিঠি লিখেন। প্রধানমন্ত্রী এই চিঠি পাওয়ামাত্র প্রকল্পগুলোর অনুমোদন দিয়ে দেন। গত মার্চ মাসে লেখা এই চিঠিই ছিল সাবেক অর্থমন্ত্রী মুহিতের লেখা শেষ চিঠি।
সিলেটভিউ২৪ডটকম / ডালিম/এসডি-২০




