আগামীকাল বুধবার সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থী ও সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক তৎপরতা রয়েছে। প্রচারণার শেষ মুহূর্তে কর্মী-সমর্থকরা আনন্দ মিছিলসহ নানাভাবে প্রচারণা চালিয়েছেন। জগন্নাথপুর পৌর শহরের প্রাণকেন্দ্র টিএন্ডটি রোড, শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থান  ও উপজেলার বাজার এলাকাগুলোতে প্রার্থীদের পোস্টার শোভা পাচ্ছে। বিভিন্ন সুর-সঙ্গীতে প্রার্থীদের প্রচার চলেছে মাইকিংয়ের মাধ্যমে। দিন থেকে রাত পর্যন্ত বসে ছিলেন না প্রার্থীদের কেউই। দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের নিয়ে উপজেলার প্রত্যন্ত স্থানে চষে বেড়িয়েছেন তারা। নানা আশার বাণী দিয়েছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে। হাট-বাজার ও চায়ের দোকানে আড্ডায় প্রার্থীর দোষ-গুণসহ নানা চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন সবাই। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নানা আঙ্গিকে পোস্ট করে নিজ নিজ  প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চাচ্ছেন অনেকে । সব মিলিয়ে উপজেলাজুড়ে নির্বাচনী আমেজ এখন উত্তুঙ্গে।

এই নির্বাচনে ৫ জন প্রার্থী চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান (মোটর সাইকেল), আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী আকমল হোসেন (নৌকা), বিদ্রোহী প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মুক্তাদির আহমদ মুক্তা (আনারস), জমিয়ত মনোনীত প্রার্থী সৈয়দ তালহা আলম (খেজুর গাছ) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্বাস উদ্দিন (ঘোড়া) প্রতীক নিয়ে লড়ছেন।


ভোটারদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, এবারের হিসাব একটু ভিন্ন। চারজন আলোচনায় রয়েছেন, কিন্তু কে হচ্ছেন উপজেলার চেয়ারম্যান এই নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই।

নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ঘরানার দুই প্রার্থী আকমল হোসেন ও মুক্তাদির আহমদ দুটি ভিন্ন প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কছেন। কিন্তু বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান বিএনপি ঘরানার লোক হিসেবে পরিচিত আতাউর রহমান স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে জমিয়তে উলামায়ের নতুন চমক সৈয়দ তালহা আলম কোমর বেঁধে মাঠে রয়েছেন।

জানা গেছে, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ নানা যাচাইবাছাই করে জগন্নাথপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আকমল হোসেনকে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা দেয়। এর আগে আকমল হোসেন ছাড়াও আওয়ামী দলীয় মনোনয়ন দাবি করেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি নুরুল ইসলাম, সাবেক সহ সভাপতি হারুনুর রশীদ, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করীম রিজু,  সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মুক্তাদির আহমদ মুক্তা, শিক্ষা ও মানবসম্পদ সম্পাদক মিন্টু রঞ্জন ধর। তবে দলীয় হাইকমান্ড আকমল হোসেনকে মনোনয়ন দিলে মুক্তাদির আহমদ মুক্তা হাল ছাড়েননি। গেল নির্বাচনের ন্যায় এবারের নির্বাচনেও তিনি দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে মনোনয়ন জমা দেন।

জানা যায়, স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগের দুটি বলয় রয়েছে। আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী আকমল হোসেন সুনামগঞ্জ-৩  আসনের সংসদ সদস্য পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান সমর্থিত সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ সভাপতি সিদ্দিক আহমদ বলয়ের। অন্যদিকে, মুক্তাদির আহমদ মুক্তা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ তনয় আজিজুস সামাদ ডন সমর্থিত বলয়ের বলে কিছু নেতাকর্মী এমন দাবি করে প্রচারণা চালিয়েছেন।

এদিকে, স্থানীয় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে প্রকাশ্যে অর্ন্তদ্বন্দ্ব কিংবা গ্রুপিং দেখা না গেলেও তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিভাজন লক্ষ্যনীয় । সচেতন ভোটারদের মতে, সমগ্র উপজেলাজুড়ে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের একটি বিরাট ভোট ব্যাংক থাকায় শেষদিকে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আকমল হোসেন মূল প্রতিদ্ধন্ধিতায় আসতে পারেন।

এদিকে, সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান স্বতন্ত্র প্রার্থী  আতাউর রহমানের প্রতি সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া রয়েছে। এছাড়া তাঁর নিজ ইউনিয়ন সৈয়দপুর-শাহারপাড়া ইউনিয়নে রয়েছে আলাদা ভোট ব্যাংকও।

অন্যদিকে, জমিয়ত মনোনীত নতুন তরুন প্রার্থী সৈয়দ তালহা আলমের জমিয়ত ও তার নিজ ইউনিয়ন মিরপুর ইউনিয়নে  রয়েছে ব্যাপক সমর্থন।  জমিয়তের কেন্দ্রীয় নেতা সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর- দক্ষিণ সুনামগঞ্জ) আসনের সাবেক এমপি এডভোকেট মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী সৈয়দ তালহার পক্ষে কোমর বেঁধে  মাঠে নেমেছেন।

অপরদিকে, জগন্নাথপুর পৌর এলাকা, হলদিপুর ও রানীগঞ্জ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ বিদ্রোহী প্রার্থী মুক্তাদির আহমদ মুক্তার রয়েছে আঞ্চলিক ভোট ব্যাংক।  তিনি প্রতিযোগিতায় চমক দেখাতে পারেন বলে অনেকেই ধারণা করছেন।  বিগত উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে তিনি জগন্নাথপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ থেকে বহিস্কৃত হন। বর্তমানে তার ভাগ্যে কী রয়েছে, এ নিয়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা।

তবে সব মিলেয়ে এবার উপজেলা নির্বাচনে চতুর্মুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখছেন ভোটাররা। তবে তারা এও মনে করছেণ, শেষমুহূর্তে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আকমল হোসেন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান আতাউর রহমানের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে।

এদিকে, উপজেলা নির্বাচনে এবার ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৫ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন । তন্মধ্যে সাবেক উপজেলা ছাত্রদল নেতা আব্দুল মতিন লাকি (টিয়া পাখি), উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জয়দ্বীপ সূত্রধর বীরেন্দ্র (তালা), উপজেলা যুবলীগের সভাপতি আবুল হোসেন লালন (মাইক), সালেহ আহমদ (চশমা) এবং সৈয়দ তুহেল মিয়া (টিউবওয়েল) রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে জয়দ্বীপ সূত্রধর বীরেন্দ্র, আব্দুল মতিন লাকি ও আবুল হোসেন লালনের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনার  কথা জানিয়েছেন ভোটাররা। তবে কে হচ্ছেন ভাইস চেয়ারম্যান এ নিয়ে ভোটারদের মধ্যে কৌতুহলের শেষ নেই।

মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৩ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন । তাঁদের মধ্যে সুফিয়া খানম সাথী (ফুটবল), রিনা বেগম (কলস) ও সেলিনা বেগম (হাঁস) প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে রিনা বেগম ও সুফিয়া খানম সাথীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই।

উল্লেখ্য , গত ২০ জুন উপজেলা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হলে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার কারণে নির্বাচন স্থগিত করা হয়। গত ২০ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামীকাল ২ নভেম্বর ৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ হবে। এবারই প্রথম এই উপজেলায় ইভিএম এর মাধ্যমে ভোট নেয়া হবে।

সিলেটভিউ২৪ডটকম/সুনু/আরআই-কে