দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে সংসদে বিরোধী দলের নেতা করতে জাতীয় পার্টির এমপিদের চিঠি দেয়ার পরই ঘটনার সূত্রপাত। এই চিঠি স্পিকারের দপ্তরে জমা দেয়ার পরই বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদের অনুসারীরা তৎপরতা শুরু করেন। তড়িঘড়ি করে ঘোষণা করা হয়েছে কাউন্সিল। গঠন করা হয় কাউন্সিল আয়োজন কমিটি। এজন্য আলাদা প্রেস ইউনিটও গঠন করা হয়। নেয়া হয় প্রস্তুতি। কিন্তু এই আয়োজনে দলের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশিত সাড়া মেলেনি। যারা এই কাউন্সিল আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হন তাদের ইতিমধ্যে জাতীয় পার্টি থেকে বহিষ্কার করেছেন দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের। ফলে দলেও তারা কোনঠাসা হয়ে পড়েছেন। সর্বশেষ এক সময়ের মহাসচিব ও সংসদে বিরোধী দলের চিফ হুইপ মশিউর রহমান রাঙাকে দলের সব পর্যায় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

এমন অবস্থায় রোববার রাতে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে পূর্ব ঘোষিত সম্মেলন স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছেন রওশনপন্থিরা। পরবর্তীতে সম্মেলন হবে কিনা এ নিয়েও স্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি। হঠাৎ করে সম্মেলন স্থগিত করায় রওশনপন্থিদের মাঝে হতাশা নেমে এসেছে। তারা বলছেন যে উদ্দেশ্য নিয়ে কাউন্সিল আহ্বান করা হয়েছিল তা পূরণ হয়নি। বরং নিজেদের দুর্বলতা সামনে প্রকাশ হয়েছে। আগামী ২৬শে নভেম্বর রওশনপন্থিদের সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। 
রওশনপন্থিরা ভেবেছিলেন শেষ মুহূর্তে অনেকেই যোগ দেবেন তাদের সঙ্গে। একাধিক সূত্র জানায়, তৃণমূল পর্যায়ে দলের নেতাকর্মীদের কোনো সাড়া মেলেনি। তৃণমূলে নেতাকর্মীরা সবাই জিএম কাদেরের নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল। উপায় না পেয়ে রওশনপন্থিরা কাউন্সিল স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে রওশনপন্থিরা বলছেন, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করতে এখনো তাদের উল্লেখযোগ্য সময়ের প্রয়োজন। 


কাউন্সিল স্থগিত কেন করা হয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে রওশন এরশাদের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সদস্য সচিব গোলাম মসীহ্‌ মানবজমিনকে বলেন, রওশন এরশাদ আমাদের তৃণমূল থেকে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করতে আদেশ দিয়েছিলেন। আমরা এখনো তাদেরকে সংগঠিত করতে পারিনি। আগামী সপ্তাহে আমাদের বর্ধিত সভা হওয়ার কথা রয়েছে। দুই থেকে এক মাস পরে কাউন্সিলের ঘোষণা আসতে পারে। তবে সামনে কি হয় এখন বলতে পারছি না।

গত ৩১শে আগস্ট এক বিজ্ঞপ্তিতে ২৬শে নভেম্বর জাতীয় কাউন্সিল আহ্বান করেন জাতীয় পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক বেগম রওশন এরশাদ। রওশন নিজে কাউন্সিল প্রস্তুত কমিটির আহ্বায়ক হয়ে যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে নাম ঘোষণা করেন পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কো-চেয়ারম্যান এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশীদ, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, সালমা ইসলাম ও মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুর নাম। সেই রাতেই জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান এর প্রেস সচিব খন্দকার দেলোয়ার জালালী স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পার্টির পৃষ্ঠপোষক কখনোই কাউন্সিল আহ্বান করতে পারেন না। রওশনের কাউন্সিল আহ্বান সম্পূর্ণ অবৈধ, অনৈতিক ও গঠনতন্ত্র পরিপন্থি। বিবৃতিতে তিনি আরও জানান, যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে যাদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে তারা কেউই কাউন্সিল আহ্বান সম্পর্কে অবগত নন।

রওশন এরশাদ কাউন্সিল স্থগিত করলেও ২৬শে নভেম্বর জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি ঢাকা মহানগর উত্তর এর কাউন্সিল হওয়ার কথা রয়েছে। সেই কাউন্সিলকে ঘিরে ব্যাপক শোডাউনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন জাপার নেতাকর্মীরা।  ওদিকে জিএম কাদেরকে সংসদের বিরোধী দলের নেতা করতে এমপিরা যে চিঠি দিয়েছিলেন তার বাস্তবায়ন দাবি করে সর্বশেষ রোববার সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় জাপা। পরদিন গতকাল দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, স্পিকার তাদের দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাস দেয়ায় তারা সংসদে যেতে সম্মত হয়েছেন। জি এম কাদেরকে বিরোধী দলের নেতা ঘোষণা করা হলে রওশন এরশাদের হাতে পার্টির আর কোনো নিয়ন্ত্রণই থাকবে না। জি এম কাদেরের অনুসারীরা আগে থেকেই বলে আসছেন, রওশন এরশাদ দলের কোনো পদে নেই। তাকে একটি সম্মানের আসনে রাখা হয়েছিল। তিনি সম্প্রতি যেসব কর্মকাণ্ড করছেন তাতে তার আর এই অবস্থানে থাকারও অধিকার নেই। 

জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু জানিয়েছেন, জি এম কাদেরের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি এখন ঐক্যবদ্ধ। কোনো ষড়যন্ত্রই আর পার্টিকে ভাঙতে পারবে না। আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টি নিজস্ব অবস্থানে থেকে ভূমিকা রাখবে। গত ২৩শে অক্টোবর পৃথকভাবে ‘উপজেলা দিবস’ পালন উপলক্ষে স্পষ্ট বিভক্তি প্রকাশ পেয়েছে জাতীয় পার্টির। ওইদিন জিএম কাদেরের নেতৃত্বে জাপার বনানীস্থ কার্যালয়ে আয়োজিত আলোচনা সভায় সরকারের ব্যাপক সমালোচনা করা হয়। একই সময়ে রওশনপন্থিদের জাতীয় প্রেস ক্লাবে আলোচনা সভায় জাতীয় পার্টি থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত নেতা মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, বিএনপির জোটে যেতে জিএম কাদের টাকা গ্রহণ করেছেন। জাতীয় পার্টির তিনজন সংসদ সদস্য ছাড়া দলের আর কোনো সংসদ সদস্য তার সঙ্গে নেই। দলের অনেকেই এখন দুই নৌকায় পা দিয়ে রয়েছেন। তারা যদি আমাদের সঙ্গে না আসে তাহলে আগামী মনোনয়নে আমরা দায়-দায়িত্ব নেবো না।

জিএম কাদেরকে উদ্দেশ করে মসিউর রহমান রাঙ্গার দেয়া বক্তব্যে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানায় জাতীয় পার্টির (কাদেরপন্থি) নেতারা। এর প্রেক্ষিতে তারা ২৬শে অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক প্রতিবাদ সভা ও বিক্ষোভ মিছিলের পরে মসিউর রহমান রাঙার কুশপুত্তলিকা পোড়ান। সমাবেশে বক্তারা জি এম কাদেরকে উদ্দেশ্য করে মসিউর রহমান রাঙ্গার দেয়া বক্তব্যকে আপত্তিকর ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ উল্লেখ করে রাঙ্গাকে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করাসহ ক্ষমা চাইতে বলেন। রাঙ্গাকে যেখানে পাওয়া যাবে সেখানেই তাকে প্রতিহত করা হবে বলে বক্তারা হুঁশিয়ারি দেন।

ক্ষমা না চাওয়ায় ২৮শে অক্টোবর এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে রাঙ্গাকে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ এর পদ থেকে অব্যাহতিসহ জাতীয় পার্টির প্রাথমিক সদস্য পদ থেকেও অব্যাহতি দেয়া হয়। এর আগে ১৪ই সেপ্টেম্বর চেয়ারম্যানের দলীয় গঠনতন্ত্রের ক্ষমতাবলে মসিউর রহমান রাঙ্গাকে প্রেসিডিয়াম সদস্যসহ সকল পদ-পদবী থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। 

এদিকে থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন রওশন এরশাদের দেশে আসা তিন দফা পিছিয়েছে। চিকিৎসা শেষে থাইল্যান্ড থেকে ২৯শে অক্টোবর রওশন এরশাদের দেশে ফেরার কথা থাকলেও হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র না পাওয়ায় ১লা নভেম্বর তিনি দেশে আসবেন বলে তার দলের নেতাকর্মীরা জানান। এই তারিখেও তার দেশে আসা হচ্ছে না। দলীয় সূত্রে জানা যায়, তিনি আগামী সপ্তাহে দেশে আসবেন। দেশে ফেরার পর তাকে সংবর্ধনা দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে রওশনপন্থি নেতারা। এদিকে জাতীয় পার্টি থেকে তাকে সংবর্ধনা দেয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন জাপার মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রওশন এরশাদকে সংবর্ধনা জানাতে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি তো আরেকটি দল করেছেন।

সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/ইআ-০৭