২৬ জুন ২০২৫-এ প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে মাদকাসক্ত ব্যক্তির সংখ্যা বর্তমানে ৮.৩ মিলিয়ন বা ৮৩ লাখ।যদিও মাদকাসক্তদের অধিকাংশই পুরুষ,তবে নারী ও শিশুদের মাঝেও মাদকাসক্তির উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। এই পরিসংখ্যান উঠে এসেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) কর্তৃক পরিচালিত এক সাম্প্রতিক জরিপ থেকে,যা এ সংস্থার নিজস্ব উদ্যোগে পরিচালিত প্রথম স্বতন্ত্র জাতীয় সমীক্ষা।এর আগে, ২০১৮ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) একটি অনুরূপ জরিপ পরিচালনা করেছিল, যেখানে দেশে মাদকাসক্ত ব্যক্তির সংখ্যা আনুমানিক ৩.৬ মিলিয়ন বা ৩৬ লাখ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।


প্রথম আলোর এই প্রতিবেদন আমাদের সামনে এমন এক বাস্তবতা তুলে ধরছে,যা কেবল উদ্বেগ নয় বরং জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর আশঙ্কার জন্ম দেয়। ২০১৮ সালে যে সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৬ লাখ,সেখানে মাত্র সাত বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ লাখে। অর্থাৎ, এই সময়ের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৬.৭ লাখ নতুন ব্যক্তি মাদকাসক্ত হয়েছেন যার মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৭ লাখ।যদি এই ভয়াবহ প্রবণতা বন্ধ না করা যায় এবং এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে অচিরেই দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা এক কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে। তখন এই সংকট কেবল একজন মানুষের স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত করবে না—এর ভয়াবহ প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে সমগ্র সমাজে। মাদকাসক্ত ব্যক্তি পড়াশোনা, কাজকর্ম কিংবা পারিবারিক দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারে না। এর ফলে অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা কমে যাবে, শ্রমশক্তির মান ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এবং পরিবারে অশান্তি ও ভাঙন দেখা দেবে।এছাড়া মাদকের প্রভাবে চুরি,ডাকাতি,খুন,ধর্ষণের মতো অপরাধ বৃদ্ধি পায়,যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে মারাত্মকভাবে অবনতির দিকে ঠেলে দেয়।মাদক একটি পরিবারকে ধ্বংস করতে যথেষ্ট—স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নষ্ট হয়,সন্তানের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঢেকে যায় এবং সামাজিক বন্ধনগুলোও একসময় ছিন্ন হয়ে পড়ে।
 


অতএব,এই প্রবণতা রোধ করতে প্রচলিত মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। যেহেতু মাদকাসক্তদের বড় একটি অংশের বয়স ১৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে,তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা জরুরি বলে আমি মনে করি। যাদের রিপোর্ট পজিটিভ আসবে, তাদের পুনর্বাসনের পাশাপাশি শাস্তির আওতায় আনতে হবে। একইসাথে, চাকরির ক্ষেত্রেও ডোপ টেস্ট চালু করা উচিত। আইন যদি কঠোর না হয়, তবে এই হার থামানো প্রায় অসম্ভব।মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই শুধুমাত্র সরকারের দায়িত্ব নয় এটি হতে হবে সমাজ, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রতিটি সচেতন নাগরিকের সম্মিলিত যুদ্ধ।তাই আমাদের সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে যার মাধ্যমে মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে তরুণ সমাজকে জানানো যাবে।আমরা যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করি তাহলে আগামী প্রজন্মকে আমরা এক ভয়াবহ ‘নেশাগ্রস্ত বাংলাদেশ’-এর হাতে তুলে দিতে বাধ্য হব।


লেখক: আরিফ রশিদ (শিক্ষার্থী), আইন ও বিচার বিভাগ, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, সিলেট।