সন্তানের মামলায় মা-বাবা আসামী: আইনের সুরক্ষা নাকি অপব্যবহার?

১.ভূমিকা:

আমাদের সমাজে মা-বাবা আর সন্তান—এই সম্পর্ককে সবসময়ই সবচেয়ে পবিত্র, অটুট আর নিঃশর্ত বন্ধন হিসেবে দেখা হয়।কেননা সন্তানের প্রথম আশ্রয় মা-বাবা, আর মা-বাবার ভরসা সন্তান। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এমন অনেক ঘটনাই সামনে এসেছে যেখানে দেখা যাচ্ছে—সন্তান নিজের মা-বাবার বিরুদ্ধেই মামলা করছে। এতে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগছে—এটা কি আইনের যথার্থ ব্যবহার, নাকি পারিবারিক সম্পর্ক ভাঙনের নতুন রূপ?

২.কেন সন্তান মা-বাবার বিরুদ্ধে মামলা করে?

এমন ঘটনা সাধারণত ঘটে যখন—

(১) পরিবারে নির্যাতন হয়,

(২) সন্তান ভরণ-পোষণ থেকে বঞ্চিত হয়,

(৩) অথবা পারিবারিক সম্পত্তি ও ঋণসংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হয় প্রভৃতি ।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি ঢাকার মোহাম্মদপুরে ১৯ বছরের তরুণী মেহরীন আহমেদ তার মা-বাবার বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন অনুযায়ী মামলা করেছিলেন, অভিযোগ ছিল শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের (সূত্র: যায়যায়দিন, ২০২৪)। 

মামলার বাদী মেহরীন আহমেদ এর ভাষ্যমতে , ‘আমার মা ও বাবা আমাকে নির্যাতন করে। আমি সুন্দর একটা জীবন চাই। জাস্টিজ পেতে আদালতে এসেছি’ (সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট)।

অন্যদিকে, ফরিদপুরে মৃত বাবার ঋণের দায়ে তিন শিশু সন্তানকে আসামি করা হয়েছিল, যা নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয় (সূত্র: কালের কণ্ঠ, জানুয়ারি ২০২৫; যমুনা টিভি)।

উপরোক্ত, এসব ঘটনা প্রমাণ করে পরিবারের ভেতরেই মাঝে মাঝে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যেখানে আদালতের শরণ নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

৩.আইনি কাঠামো:

বাংলাদেশে সন্তান ও মা-বাবার অধিকার রক্ষায় বেশ কিছু আইন রয়েছে—

(১) পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন, ২০১০ – পরিবারের মধ্যে শারীরিক, মানসিক, আর্থিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে মামলা করার সুযোগ দেয়।

(২) পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩– সন্তানের ভরণ-পোষণের অধিকার নিশ্চিত করে।

(৩) অভিভাবকত্ব আইন, ১৮৯০– শিশুর তত্ত্বাবধান ও অভিভাবকত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব হলে আদালত সিদ্ধান্ত দেয়।

(৪) পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩– সন্তানকে বাধ্য করে বৃদ্ধ মা-বাবার ভরণ-পোষণ দিতে।

অর্থাৎ, আইনের কাঠামোতে দু’দিকই সুরক্ষিত—সন্তানের অধিকারও আছে, আবার মা-বাবার অধিকারও আছে।

৪.আইন: সুরক্ষা নাকি অপব্যবহার?

সুরক্ষার দিক:

(১) সন্তান যদি সত্যিই নির্যাতনের শিকার হয়, তবে আদালতে যাওয়ার অধিকার তার আছে।

(২) মা-বাবা যদি অবহেলিত হন, তবে তারাও সন্তানের বিরুদ্ধে ভরণ-পোষণের মামলা করতে পারেন।

(৩) আইন পরিবারে ন্যায় প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করে।

অপব্যবহারের দিক:

(১) অনেক সময় পারিবারিক রাগ-অভিমান বা সম্পত্তি বিরোধে মামলা হয়, যা প্রকৃতপক্ষে অপব্যবহার।

(২) মামলা হলে সামাজিকভাবে পরিবার কলঙ্কিত হয়।

(৩) দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পেতে দেরি করে।

৫.সামাজিক প্রতিক্রিয়া:

এমন মামলা হলে সমাজে অনেকেই একে নৈতিক অবক্ষয়ের লক্ষণ হিসেবে দেখেন। আবার কেউ কেউ বলেন—এটি প্রমাণ করে যে সন্তান বা মা-বাবা ন্যায়বিচারের জন্য আদালতের উপর নির্ভর করছে। সত্যিকার অর্থে, এই প্রবণতা আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তনের প্রতিফলন।

৬.সমাধান কী হতে পারে?

প্রথমত, আদালতে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করা জরুরি। হাইকোর্ট ইতিমধ্যেই নির্দেশ দিয়েছে যে অভিভাবকত্ব মামলা ছয় মাসের মধ্যে শেষ করতে হবে (সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ২০২৩)।

দ্বিতীয়ত, পরিবারে মধ্যস্থতা ও কাউন্সেলিং চালু করা দরকার, যাতে মামলা আদালতে না গিয়েও সমাধান সম্ভব হয়।

পরিশেষে, সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে—মামলা যেন শেষ অবলম্বন হয়, প্রথম পদক্ষেপ নয়।

৭.উপসংহার:

মা-বাবা আর সন্তানের সম্পর্ককে কেউই আদালতের কাঠগড়ায় দেখতে চান না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নির্যাতন, অবহেলা বা আর্থিক জটিলতায় এই সম্পর্ক ভেঙে আদালতের আশ্রয় নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। তাই বলা যায়—এই আইন একদিকে সন্তানের জন্য সুরক্ষা, অন্যদিকে যদি অপব্যবহার হয় তবে তা পরিবারকে আরও দুর্বল করে।

শেষ পর্যন্ত আইন শুধু একটি হাতিয়ার। এর ব্যবহার সঠিক হবে কিনা, তা নির্ভর করছে আমরা পরিবারে কতটা ভালোবাসা, দায়িত্ব আর আস্থা ধরে রাখতে পারি তার উপর।

 

লেখক পরিচিতি: শাহরিয়ার আলম মেহেদী তাপাদার, শিক্ষার্থী, আইন ও বিচার বিভাগ, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ।