আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস। এই বিশেষ দিনে আমার পিতা-মাতা সহ সকল শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের প্রতি জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা।

‘শিক্ষক’ শব্দটি এসেছে ‘শিক্ষা’ শব্দ থেকে। শব্দটি কারও কাছে হয়তো ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু আমার কাছে এটি অত্যন্ত বিশাল ও মহিমান্বিত।
যার কাছ থেকে আমরা জ্ঞান, বিদ্যা, নীতি ও আচরণ শিখি, তিনিই প্রকৃত শিক্ষক। প্রত্যেক মানুষের জীবনের প্রথম শিক্ষক হচ্ছেন তাঁর পিতা-মাতা, কারণ আমরা প্রথমে কথা বলা,আচরণ,ভদ্রতা—সবই তাদের কাছ থেকেই শিখি।


মানুষের বয়স বাড়ার সাথে সাথে যেমন তার আচরণে পরিবর্তন আসে, তেমনি জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে আমাদের গঠনপ্রক্রিয়ায় শিক্ষকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। একজন শিক্ষার্থীর মূলভিত্তি তৈরি হয় প্রাথমিক শিক্ষা জীবন থেকেই। তাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।যেমন একটি দশতলা ভবন নির্মাণ করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন মজবুত ভিত্তি, তেমনি জীবনে সফল হতে হলে প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি শক্ত হতে হবে। যদি ভিত্তি দুর্বল হয়, তবে ভবন যেমন দাঁড়াতে পারে না, তেমনি দুর্বল প্রাথমিক শিক্ষা উচ্চশিক্ষায় উন্নতি আনতে ব্যর্থ হয়। এজন্যই দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়তে হলে প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বোচ্চ বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। শক্ত ভিত্তির ওপরেই দাঁড়িয়ে থাকে একটি টেকসই ভবন, আর ভালো প্রাথমিক শিক্ষার ওপরেই গড়ে ওঠে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ।

আজকাল মনে হয়, সমাজে মায়া-মমতা, শ্রদ্ধা ও স্নেহ ভালোবাসা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। আধুনিকতার নামে নষ্টামি বাড়ছে, নিজের সংস্কৃতি ভুলে বিদেশি সংস্কৃতি অনুসরণ বাড়ছে। একান্নবর্তী পরিবার আজ প্রায় বিলুপ্ত—যেখানে একসময় এটি ছিল আমাদের সমাজের মূল ভিত্তি। এখন সবাই শুধু নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। এ প্রবণতা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য বড় হুমকি।

আমরা অনেক পরিবর্তন করেছি, কিন্তু যেসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন সবচেয়ে দরকার, সেখানে আমরা কতটা মনোযোগ দিচ্ছি?আমাদের প্রতিবেশী দেশ মালয়েশিয়া আজ অনেক এগিয়ে—তাহলে আমরা কেন পিছিয়ে থাকব? আমাদেরও এগিয়ে যেতে হবে, আর সেই অগ্রযাত্রার প্রথম শর্ত হলো—শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া।একজন শিক্ষার্থীর মূলভিত্তি যেহেতু তৈরি হয় প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে, তাই প্রাথমিক শিক্ষকদের অবস্থার উন্নয়ন জরুরি। বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন বাস্তবতার তুলনায় খুবই কম, ফলে অনেক মেধাবী ব্যক্তি এই পেশায় আসতে চান না। আবার অনেকে অনাগ্রহের কারণে ক্লাসে যথাযথ মনোযোগ দেন না, যার ফলে শিক্ষার্থীদের ভিত্তি দুর্বল থেকে যাচ্ছে।

সুতরাং, শিক্ষার মান উন্নত করতে হলে প্রথমেই প্রাথমিক শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা ও বেতন বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে মেধাবীরা এই পেশায় আগ্রহী হন। ভালো শিক্ষক ছাড়া ভালো শিক্ষা সম্ভব নয়। এটি ঠিক যেমন—একটি ভবন ভালো রড ছাড়া শক্ত হতে পারে না। শিক্ষকই শিক্ষার্থীর মান নির্ধারণ করেন, যেমন রড নির্ধারণ করে ভবনের শক্তি।আজ শিক্ষক দিবসে শুধু শুভেচ্ছা জানানোই যথেষ্ট নয়; আমাদের ভাবতে হবে—শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়। বিশ্বের বহু দেশে শিক্ষকরা অন্য পেশাজীবীদের চেয়ে দ্বিগুণ বেতন পান এবং বিশেষ সম্মান ভোগ করেন।আমাদেরও উচিত শিক্ষকতা পেশাকে দেশের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ পেশায় পরিণত করা। বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে পারলে মেধাবীরা এই পেশায় যুক্ত হবেন, আর তাতেই আসবে জাতির প্রকৃত পরিবর্তন।

মনে রাখতে হবে—
“শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড।”
অতএব,শিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া সময়ের দাবি।
 

লেখক: আরিফ রশিদ, শিক্ষার্থী, আইন ও বিচার বিভাগ মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, সিলেট।