সিলেট নগরীর ফুটপাত যেন আবারও ফিরে গেছে আগের সেই বিশৃঙ্খলার রাজ্যে। একদিকে উচ্ছেদ অভিযান, অন্যদিকে অভিযান শেষ হওয়া মাত্রই পাল্লা দিয়ে ফুটপাত দখলে মরিয়া হয়ে উঠে হকারসহ ব্যবসায়ীরা। সিলেট শহর থেকে হওয়া নগর সিলেটের সড়কে বিশৃঙ্খলার শীর্ষ দুটি কারণ হচ্ছে- ভ্রাম্যমাণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের (হকার) যত্রতত্র পণ্য নিয়ে বসা ও অবৈধ গাড়ি পার্কিং। বছরের পর বছর ধরে চলা এ দুই সমস্যার সমাধান কোনোভাবেই হচ্ছে না। হকাররা ছাড়েন না সড়ক-ফুটপাত, প্রায় ২৪ ঘণ্টাই সড়কে থাকে অবৈধ গাড়ি পার্কিং। মহানগরীর বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, পথচারী, প্রশাসন, নগরভবন কর্তৃপক্ষ সবাই চান সড়ক-ফুটপাত দখলমুক্ত হতে। কিন্তু অদৃশ্য কোনো শক্তির বলে যেন সড়ক-ফুটপাত থেকে সরানো যায় না হকারদের। উচ্ছেদ করা যায় না অবৈধ গাড়ি পার্কিং। বলা যায়- এই দুই ক্ষেত্রে বার বার ব্যর্থ হয়েছেন ‘জেলা প্রশাসন, এসএমপি পুলিশ ও সিসিক’। অভিযান চলাকালীন সময়ে রাস্তা গরম থাকলেও পরবর্তী সময়ে ‘যেই লাউ সেই কদু।’

সরেজমিনে বুধবার (১৯ নভেম্বর) বিকেল চারটার দিকে নগরীর বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়, নগরীর প্রধান সড়ক, বন্দরবাজার, জিন্দাবাজার, আম্বরখানা, সোবহানীঘাট, তালতলা, রিকাবীবাজার এলাকায় হকাররা দোকানপাট বসিয়ে দেদারসে ব্যবসা করছেন। হকার ভ্যান-ট্রলি নিয়ে নিজেদের ভাসমান দোকানের মালামালের পসরা সাজিয়ে রাস্তায় বসে বেচাকেনা করছেন। হোটেল ব্যবসায়ীরা নিজেদের হোটেলের সামনের ফুটপাতে টেবিল, বড় পাতিলসহ অন্যান্য জিনিসপত্র বসিয়ে ফুটপাত দখল করে রেখেছেন। এতে পথচারীদের যাতায়াতে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীরাও নিজের অস্থায়ী দোকানপাট বসিয়ে ফুটপাতকে পূর্বের অবস্থায় নিয়ে এসেছেন।


এর আগে, ফুটপাতে দখলমুক্ত করতে ব্যাপক এ্যাকশনে ছিল প্রশাসন। সিলেটের জেলা প্রশাসন, পুলিশ কমিশনার ও সিলেট সিটি কর্পোরেশন হকারদের রাস্তা ছাড়া করতে এবং অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা স্ট্যান্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। প্রতিদিনই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হতো। কিন্তু বেশ কয়েকদিন থেকে অজানা কোনো কারণে আবার সবকিছু ঘোলাটে হয়ে গেছে। গত দুই সপ্তাহ থেকে প্রশাসনের তদারকি না থাকার ফলে ফের নগরীর রাস্তাঘাট দখলে নিতে শুরু করেছেন হকাররা।

এর আগে অক্টোবরে সিলেট নগরীতে শৃঙ্খলা ফেরাতে একযোগে মাঠে নেমেছে জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন ও পুলিশ প্রশাসন। ফুটপাত দখল, বেপরোয়া পার্কিং ও অবৈধ যানবাহন চলাচল রোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন তারা। সময় সময় অভিযান চালিয়ে তাদের সরানো হলেও তা স্থায়ী কোনো সমাধান করা হয়নি। তবে এবার হকারদের লালদিঘীরপাড়ে অস্থায়ী মার্কেটে ফেরানোর জন্য ব্যাপক ঢাক-ঢোল পেঠানো হয়েছিল, তাতেও কোনো লাভ হয় নি। প্রশাসনের সকল কাজ ভেস্তে গেল। লালদিঘীরপাড়ে অস্থায়ী মার্কেট হলেও হকাররা সেখানে যান নি। তারাও এখনও বহাল রয়েছেন রাস্তায়।

এদিকে জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন ও পুলিশ প্রশাসন বলেছিল, রাস্তা থেকে হকারদের উচ্ছেদ করে নগরীর লালদিঘীরপাড়ে অস্থায়ী মার্কেটে ফেরানোর ক্ষেত্রে সব রকমের প্রস্তুতি নেওয়া হবে। প্রয়োজনে সিলেটের ফুটপাতকে ঘিরে কঠোর অ্যাকশনে নামবে তারা। সড়ক ও ফুটপাতে কোন হকার বসলে তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে কঠোর ব্যবস্থা। কিন্তু সেটিও এখন কেবল ‘কথার বুলি’। বাস্তবে তো তার কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না।

দেখা গেছে, অভিযান শুরু হলে যেমন সড়ক-ফুটপাত ফিরে যায় দখলমুক্ত অবস্থায়। তেমনি অভিযানের কয়েকদিন পরই আবার পুরনো চিত্র। প্রতিদিন বেলা বাড়ার সাথে সাথে থেকে শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত রাস্তাজুড়ে চলে বেচাকেনা। গাড়ি-মানুষের ধাক্কাধাক্কি আর চিরচেনা যানজট।  কয়েক সপ্তাহ আগেও যেখানে প্রশাসনের কড়া নজরদারি ও অভিযানের ফলে হাঁটতে পারছিলেন স্বস্তিতে। আজ সেখানে ফের পসরা সাজিয়ে বসছেন হাজারো অবৈধ হকার। বিশেষ করে নগরীর বন্দরবাজার, জিন্দাবাজার, আম্বরখানা, সোবহানীঘাট, রিকাবীবাজারসহ বিভিস্থ স্থানে প্রতিদিন বিকেল গড়াতেই ফুটপাত পরিণত হচ্ছে অস্থায়ী বাজারে। পোশাক, জুতা, ব্যাগ, প্রসাধনী কিংবা নিত্যপণ্য-সবকিছু নিয়েই দখল হয়ে যাচ্ছে পথচারীদের চলাচলের একমাত্র নিরাপদ স্থানটি।

এদিকে নগরবাসীর প্রত্যাশা ছিল- এবার হয়তো দখলমুক্ত হতে পারে সিলেটের সড়ক ও ফুটপাত, কমতে পারে ভোগান্তি। কিন্তু অবস্থা সেই আগের মতোই। অভিযানের ২-৩ দিন কিছুটা দখলমুক্ত ছিলো সড়ক-ফুটপাত। পরে পুরনো চিত্রে ফিরে মহানগরের রাস্তাঘাট। বেলা গড়ানোর পর থেকেই মহানগরের ব্যস্ততম বন্দর, জিন্দাবাজার ও আম্বরখানাসহ বিভিন্ন জায়গায় সড়ক ও ফুটপাত দখল করে পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন হকাররা, মধ্যরাত পর্যন্ত করেন বেচা-বিকি। ফলে রাত-দিন এসব এলাকায় সড়কে যানজট লেগেই থাকে। ভোগান্তি পোহান যাত্রীসাধারণ ও নগরবাসী। ফুটপাত-রাস্তা দিয়ে স্বস্তিতে হাটতে পারেন না পথচারীরা। সড়কের আয়তন কমে গিয়ে একটু পরপরই লাগে যানজট। বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয় বন্দরবাজারস্থ সিলেট প্রধান ডাকঘরের সামনে দিয়ে গেলে। এখানে প্রতিদিন বিকাল থেকে প্রায় পুরো রাস্তা দখল করে বসে যান হকাররা। মধ্যরাত পর্যন্ত হাক-ডাক দিয়ে বেচা-বিকি করেন সবজি-মাছসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্য। এছাড়া সড়কে অবৈধ পার্কিংয়ের ভোগান্তি তো আছেই। আর এবার হকাররা স্থায়ীভাবে আসন গড়তে চাচ্ছেন ফুটপাতে, চাচ্ছেন ‘বিশৃঙ্খলার স্বীকৃতি’।

ভুক্তভোগী পথচারীরা বলছেন, ‘একদিন কড়া, পরদিন ঢিলা’ এই নীতির কারণেই হকাররা আগের চেয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ব্যবসায়ীরাও অভিযোগ করছেন, হকারদের দখলে দোকানের সামনেই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দোকানে ক্রেতা ঢুকতে পারছেন না। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বেচা-কেনা পড়ছে ঝুঁকিতে।

লালদিঘীরপাড়ে হকারদের জন্য পুনর্বাসনকেন্দ্র তৈরি সত্ত্বেও তারা কেন রাস্তায় ফিরে আসছেন-তা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। অনেকের মতে, চাঁদাবাজি ও দুর্বল তদারকির কারণেই হকারদের দৌরাত্ম্য থামানো যাচ্ছে না। যদিও ‘জেলা প্রশাসন, এসএমপি পুলিশ ও সিসিক’ এই তিন সংস্থা কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছে এবং কয়েকদিন বেশ জোরালোভাবে অভিযান পরিচালনা করেছে। কিন্তু দিন যাওয়ার সাথে সাথে ফের অভিযানে ভাটা পড়েছে। ফের দখল হতে শুরু করেছে নগরীর রাস্তা।

সিলেটের সচেতন নাগরিকরা বলছেন, হকাররা কেনো দিনের পর দিন, মাসের পর মাস অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে তা যাচাই করা দরকার। পূর্ব থেকে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা না করলে অভিযান কেবল দায়সারা হয়ে থাকবে। এতে কোনো ফল আসবে না। তবে ফলাফল না আসার কারণ, পুলিশ ও সিসিক এর লাইনম্যানের চাঁদাবাজির কারণে হকারদের বেপরোয়া দৌরাত্ম্য বন্ধ করা যাচ্ছেনা। চাঁদাবাজি বন্ধ না করার কারণে হকাররা তাদের ব্যবসা  দিনের পর দিন বাড়িয়ে চলছে। সিলেট মহানগরীতে পুরোদমে হকার উচ্ছেদ না হওয়ায় নগরীর অনেকেই জানতে চাচ্ছেন কবে হকারদের দৌরাত্ম্য শেষ হবে?

সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার সিলেটভিউকে বলেন, ‘অভিযান সাময়িক বন্ধ ছিল, তবে খুব দ্রুতই আবার শুরু হবে। এবং এইবার কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। আগে লালদিঘীরপাড় হকার্স মার্কেটে পর্যাপ্ত জায়গা ছিল না, কিন্তু এখন সেটি সম্পূর্ণ প্রস্তুত। এখানে ২–৩ হাজার হকার সহজেই ব্যবসা করতে পারবেন। তাদের ব্যবসার জন্য আমরা সর্বোচ্চ ব্যবস্থা করেছি। এরপরও যদি কেউ রাস্তায় বসতে চায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া আমাদের কোনো পথ থাকবে না।’

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী সিলেটভিউকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অন্যান্য পরিস্থিতির জন্য আমাদের অভিযান বন্ধ ছিল। তবে শীঘ্রই আবার নগরীজুড়ে প্রশাসনের অভিযান শুরু হবে। তবে নগরীর ফুটপাতে হকার যারা রয়েছেন এবং যাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে এইবার আর কোনো সতর্কবার্তা বা সতর্ক করা হবে না। যারাই জড়িত থাকবেন তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর প্রদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। পুনর্বাসনের জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার পরও যারা পুনরায় ফুটপাতে বসে ব্যবসা করছেন, এইবার তাদেরকে আর কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।’

সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম সিলেটভিউকে বলেন, ‘হকার উচ্ছেদে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। এতদিন আমরা সহনশীলতা দেখিয়ে ও সহযোগিতাপূর্ণভাবে কাজ করেছি। কিন্তু যদি হকাররা এখনো রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে বসতে চান, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সিলেটকে সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও শৃঙ্খলাপূর্ণ শহর হিসেবে গড়ে তুলতে যা যা প্রয়োজন, প্রশাসন সেই সব পদক্ষেপ নেবে।’


সিলেটভিউ২৪ডটকম/ এহিয়া