আমি আইনের ছাত্র, ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের না। ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে তেমন কোনো আগ্রহও নেই। ছোটকাল থেকেই আগ্রহ আইন বিষয়ে পড়ালেখা করার এবং আইনজীবী হওয়ার। ঢাকায় গতবছর মাইলস্টোন কলেজে বিমান দুর্ঘটনার পর হঠাৎ মনে একটি প্রশ্ন জন্মালো—বাংলাদেশ কি আজ পর্যন্ত কোনো বিমান বা হেলিকপ্টার তৈরি করেছে? তখন বিষয়টি নিয়ে খোঁজ করি। সার্চ দিয়ে দেখি, উত্তর হচ্ছে—না। আরও জানলাম, যে বিভাগ এই ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে, সেই এরোনটিক্যাল বা এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ দেশের সরকারি পাঁচটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনোটিতেই নেই।
এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং মূলত বিমান, হেলিকপ্টার ও ড্রোনের ডিজাইন, তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে কাজ করে। আর এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং এর চেয়ে বিস্তৃত; এতে রকেট, স্যাটেলাইট ও মহাকাশযানও অন্তর্ভুক্ত। সহজভাবে বললে, আকাশ ও মহাকাশে উড়ে এমন যান তৈরির বিজ্ঞানই এই বিষয়গুলোর মূল।
বাংলাদেশের সরকারি পাঁচটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হলো—বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (BUET), চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (CUET), খুলনা ইউনিভার্সিটি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (KUET), রাজশাহী ইউনিভার্সিটি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (RUET) এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (DUET)। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, এই পাঁচটির একটিতেও এখনো পূর্ণাঙ্গ এরোনটিক্যাল বা এরোস্পেস বিভাগ চালু হয়নি। ফলে যারা এই বিষয়ে পড়তে চায়, তাদের বিদেশে যেতে হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশ বিমান, হেলিকপ্টার, উন্নত ড্রোন ও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে কিনে আনে। Bangladesh Air Force যুদ্ধবিমান ও সামরিক সরঞ্জাম বিদেশ থেকে সংগ্রহ করে এবং বড় ধরনের রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রেও বিদেশি প্রযুক্তির উপর নির্ভর করতে হয়। এতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয় এবং প্রযুক্তিগতভাবে আমরা অন্য দেশের উপর নির্ভরশীল থেকে যাই।দেশে যদি এরোনটিক্যাল ও এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ চালু করা হয়, তাহলে ধীরে ধীরে দক্ষ প্রকৌশলী তৈরি হবে। শুরুতে হয়তো বড় যুদ্ধবিমান নয়, কিন্তু ছোট প্রশিক্ষণ বিমান, নজরদারি ড্রোন বা হালকা প্রযুক্তির উড়োজাহাজ দেশেই তৈরি বা সংযোজন করা সম্ভব হতে পারে। ভারতের Hindustan Aeronautics Limited নিজস্ব বিমান উৎপাদনে কাজ করছে, আর Indian Space Research Organisation মহাকাশ গবেষণায় আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। এসব উদাহরণ দেখায়, পরিকল্পনা থাকলে উন্নয়নশীল দেশও এই খাতে এগোতে পারে।অর্থনৈতিক দিক থেকেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বে Boeing ও Airbus শুধু বিমান তৈরি করে না; তারা গবেষণা, সফটওয়্যার, যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণ শিল্পের মাধ্যমে বিশাল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশে যদি বিমান রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রাংশ তৈরির শিল্প গড়ে ওঠে, তাহলে দেশে কর্মসংস্থান বাড়বে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে, এটি শুধু একটি নতুন বিভাগ খোলার বিষয় নয়; এটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, প্রতিরক্ষা শক্তি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত। আমি আইনের ছাত্র হয়েও বিষয়টি নিয়ে ভাবতে বাধ্য হয়েছি। কারণ একটি দেশের উন্নয়ন শুধু আইনের মাধ্যমে নয়, প্রযুক্তির মাধ্যমেও হয়। এখন প্রশ্ন হলো—আমরা কি ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেব, নাকি সবসময় অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়েই থাকব?
লেখক: আরিফ রশিদ, শিক্ষার্থী, আইন ও বিচার বিভাগ, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি সিলেট।




