বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বড় স্বাস্থ্যচ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো জীবনযাপনজনিত রোগের দ্রুত বিস্তার।
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা কিংবা হৃদরোগের মতো সমস্যার পাশাপাশি এখন নীরবে বাড়ছে আরেকটি জটিল রোগ Inflammatory Bowel Disease IBD |
একসময় পশ্চিমা বিশ্বের রোগ হিসেবে পরিচিত এই অসুখ এখন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে | বাংলাদেশেও গত কয়েক বছরে IBD রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা মনে করছেন | উদ্বেগের বিষয় হলো, অধিকাংশ মানুষ এখনও এই রোগ সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতন নন | ফলে অনেক রোগী দীর্ঘদিন ভুল চিকিৎসা নিয়ে জটিলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন |
IBD মূলত অন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত রোগ |
এর প্রধান দুটি ধরন হলো Crohn’s Disease এবং Ulcerative Colitis | এই রোগে অন্ত্রের ভেতরে প্রদাহ সৃষ্টি হয়, যা ধীরে ধীরে রোগীর স্বাভাবিক জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে |
পেটব্যথা, দীর্ঘদিন পাতলা পায়খানা, মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, ওজন কমে যাওয়া, দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা ইত্যাদি এর সাধারণ উপসর্গ |
অনেক সময় রোগীরা এসব সমস্যাকে সাধারণ গ্যাস্ট্রিক, আমাশয় বা খাদ্যজনিত সমস্যা মনে করে অবহেলা করেন | কিন্তু দীর্ঘদিন অবহেলিত অবস্থায় থাকলে IBD অন্ত্রের স্থায়ী ক্ষতি, অপুষ্টি, এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে |
বিশ্বজুড়ে IBD বৃদ্ধির পেছনে আধুনিক জীবনযাপনকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে |
নগরায়ন, ফাস্টফুড সংস্কৃতি, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ এবং শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া মানুষের অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে প্রভাবিত করছে |
বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের খাদ্যাভ্যাস ও পরিবেশগত পরিবর্তন অন্ত্রের ভেতরে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট করছে | এই পরিবর্তন শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করে, ফলে শরীর নিজেই অন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রদাহ সৃষ্টি করতে শুরু করে |
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সমস্যা আরও গুরুত্বপূর্ণ | কয়েক দশক আগেও গ্রামবাংলার মানুষ প্রাকৃতিক ও ঘরোয়া খাবারের ওপর নির্ভরশীল ছিল | কিন্তু বর্তমানে শহর ও গ্রাম উভয় জায়গায়ই প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত তেল-চর্বি, কোমল পানীয় ও রাস্তার অস্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবহার বেড়েছে | শিশু ও তরুণদের মধ্যে ফাস্টফুডের প্রতি আসক্তি উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে | এসব খাবারে অতিরিক্ত চিনি, লবণ, কৃত্রিম রং ও সংরক্ষণকারী উপাদান থাকে, যা অন্ত্রের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করতে পারে |
অন্যদিকে শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়াও একটি বড় কারণ |
প্রযুক্তিনির্ভর জীবন মানুষকে ক্রমেই অলস করে তুলছে | দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা, মোবাইল ও কম্পিউটারে অতিরিক্ত সময় কাটানো এবং নিয়মিত ব্যায়ামের অভাব শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রমের পাশাপাশি অন্ত্রের স্বাস্থ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে |
গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম অন্ত্রের প্রদাহ কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে |
মানসিক চাপও IBD বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে | আধুনিক জীবনে প্রতিযোগিতা, চাকরির অনিশ্চয়তা, পারিবারিক চাপ, সামাজিক উদ্বেগ এবং ডিজিটাল জীবনের অতিনির্ভরতা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলছে |
দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে এবং অন্ত্রের প্রদাহ বাড়িয়ে দিতে পারে | অনেক IBD রোগীই জানান, মানসিক চাপ বাড়লে তাদের উপসর্গও বেড়ে যায় |
বাংলাদেশে আরেকটি বড় সমস্যা হলো অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার | সামান্য জ্বর, সর্দি কিংবা পেটের সমস্যায় অনেক মানুষ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করেন | এতে অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস হয় এবং অন্ত্রের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয় | দীর্ঘমেয়াদে এটি IBD-এর ঝুঁকি বাড়াতে পারে | শুধু তাই নয়, অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের মতো বৈশ্বিক সমস্যাও তৈরি করছে |
ধূমপানও IBD-এর ক্ষেত্রে একটি বড় ঝুঁকির কারণ | বিশেষ করে Crohn’s Disease-এর সঙ্গে ধূমপানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে | ধূমপান অন্ত্রের রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দেয় এবং প্রদাহ বাড়িয়ে তোলে | একইভাবে পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব ও অনিয়মিত জীবনযাপন শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দ নষ্ট করে, যা দীর্ঘমেয়াদে রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে |
IBD শুধু শারীরিক সমস্যা নয়; এটি মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাও তৈরি করে | একজন রোগী যখন দিনে বহুবার টয়লেটে যেতে বাধ্য হন, তখন তার স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয় | শিক্ষার্থী পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়তে পারে, চাকরিজীবী কর্মক্ষমতা হারাতে পারেন, এমনকি সামাজিক সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি হতে পারে | দীর্ঘদিনের অসুস্থতা অনেক রোগীকে হতাশা ও উদ্বেগে ভোগায় |
তাহলে সমাধান কোথায়?
সমাধানের প্রথম ধাপ হলো সচেতনতা বৃদ্ধি | মানুষকে বুঝতে হবে যে দীর্ঘদিনের পেটব্যথা, পাতলা পায়খানা, রক্তমিশ্রিত মল বা ওজন কমে যাওয়া সাধারণ সমস্যা নয় | এসব উপসর্গ দীর্ঘদিন থাকলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি | অনেক মানুষ লজ্জা বা অবহেলার কারণে চিকিৎসা নিতে দেরি করেন, যা রোগকে আরও জটিল করে তোলে |
দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফলমূল, আঁশযুক্ত খাবার ও পর্যাপ্ত পানি থাকতে হবে | অতিরিক্ত ফাস্টফুড, কোমল পানীয়, অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমাতে হবে | শিশুদের ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস শেখানো দরকার |
তৃতীয়ত, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়ামকে জীবনের অংশ করতে হবে | প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম শরীরের সামগ্রিক সুস্থতার পাশাপাশি অন্ত্রের স্বাস্থ্যও ভালো রাখতে সাহায্য করে | একইসঙ্গে পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা জরুরি |
চতুর্থত, মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব দিতে হবে | পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ কমানোর পরিবেশ তৈরি করা দরকার | ধ্যান, প্রার্থনা, সামাজিক যোগাযোগ ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে |
অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ | চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বন্ধ করতে হবে |
ফার্মেসি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইন প্রয়োগ জরুরি |
জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকেও এ ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে |
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়ে ( Rural Medical Practitioner) চিকিৎসকদের IBD সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে রোগ দ্রুত শনাক্ত করা যায় |
একইসঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহ জরুরি, কারণ সঠিক তথ্য ছাড়া কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া সম্ভব নয় |
মিডিয়াও সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে | টেলিভিশন, পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে মানুষকে IBD সম্পর্কে জানাতে হবে |
স্কুল-কলেজেও স্বাস্থ্যশিক্ষার অংশ হিসেবে অন্ত্রের স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত |
IBD কেবল একটি রোগ নয় এটি আধুনিক জীবনযাপনের প্রতিচ্ছবি | আমরা যত বেশি অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের দিকে ঝুঁকছি, তত বেশি এই ধরনের রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে | তাই শুধু চিকিৎসার ওপর নির্ভর করলেই হবে না আমাদের জীবনযাপনেও পরিবর্তন আনতে হবে |
সুস্থ জীবনযাপন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, মানসিক সুস্থতা এবং সচেতন স্বাস্থ্যনীতি এসবের সমন্বয়ই পারে IBD-এর বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে |
কারণ একটি সুস্থ জাতি গঠনের জন্য শুধু হাসপাতাল নয়, প্রয়োজন স্বাস্থ্যসচেতন সমাজও।
মনজুরুল মাআবুদ: মাস্টার্স অব পাবলিক হেলথ (স্বাস্থ্য ও পুষ্টি)।




