বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের জন্য দিন দিন অসহনীয় হয়ে উঠছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মোট চিকিৎসা ব্যয়ের একটি বড় অংশই চলে যায় ওষুধ ও রোগনির্ণয় পরীক্ষায়। একটি পরিবারের মাসিক আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হওয়ায় বহু মানুষ অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে পারছেন না। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত কষ্টদায়ক।

স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। তাই জনগণের প্রত্যাশা থাকে—চিকিৎসা হবে সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং মানবিক। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় রোগীরা চিকিৎসা নিতে গিয়ে অবহেলা, দুর্ব্যবহার, অতিরিক্ত খরচ এবং বাণিজ্যিক মানসিকতার মুখোমুখি হন। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা, ক্ষোভ ও আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে।
ডাক্তার সমাজ নিঃসন্দেহে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানিত পেশাজীবী শ্রেণি। একজন চিকিৎসক তৈরি হওয়ার পেছনে রাষ্ট্র ও জনগণের বিপুল বিনিয়োগ থাকে। দীর্ঘ অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে একজন চিকিৎসক গড়ে ওঠেন। আমাদের দেশে অসংখ্য সৎ, দক্ষ ও মানবিক ডাক্তার আছেন, যারা দিন-রাত পরিশ্রম করে মানুষের জীবন বাঁচাতে কাজ করছেন। তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা রইলো।
তবে একই সঙ্গে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, কিছু চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অনৈতিক কর্মকাণ্ড পুরো স্বাস্থ্যখাতকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। অতিরিক্ত ভিজিট ফি, ৪/৫ মিনিট রোগী দেখে বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রহণ, অপ্রয়োজনীয় টেস্ট করিয়ে কমিশন বাণিজ্য, নির্দিষ্ট কোম্পানির ওষুধ লেখার বিনিময়ে সুবিধা গ্রহণ—এসব অভিযোগ এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।
অনেক মানুষের অভিজ্ঞতা হলো, চিকিৎসা নিতে গিয়ে তাঁরা প্রয়োজনীয় সহানুভূতি ও মানবিক আচরণ পান না। অথচ একজন অসুস্থ মানুষের কাছে চিকিৎসা শুধু ওষুধ বা প্রেসক্রিপশন নয়; আন্তরিকতা, সম্মান ও আশ্বাসও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ডাক্তার ও নার্সদের পেশাগত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি রোগীদের সঙ্গে কিভাবে মানবিক আচরণ করতে হয়, কীভাবে কথা বলতে হয় এবং কীভাবে মানসিক সহায়তা দিতে হয়—এসব বিষয়েও বিশেষ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।
সরকারি অর্থে দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অতিরিক্ত বাণিজ্যিক মনোভাবও মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি করছে। সাধারণ মানুষ চায়—সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকরা আরও দায়িত্বশীল, আন্তরিক ও সময়নিষ্ঠ ভূমিকা পালন করুন, যাতে গরিব ও সাধারণ মানুষ কম খরচে মানসম্মত চিকিৎসা পেতে পারে।
সম্প্রতি স্বাস্থ্যখাত নিয়ে সাংবাদিক মাসুদ কামালের বক্তব্য নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। তাঁর বক্তব্যের মূল প্রতিপাদ্য ছিল—স্বাস্থ্যখাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও মানবিকতা নিশ্চিত করা। কোনো পেশাকে অসম্মান করা নয়; বরং স্বাস্থ্যখাতের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অসাধু চর্চার বিরুদ্ধে গঠনমূলক সমালোচনা ও সংস্কারের দাবি তোলাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
চিকিৎসা একটি মহান পেশা। এটি শুধু আয়ের উৎস নয়, মানবসেবারও বড় দায়িত্ব। তাই স্বাস্থ্যখাতে ওষুধ কোম্পানির অনৈতিক প্রভাব, ডায়াগনস্টিক কমিশন বাণিজ্য, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং রোগী শোষণের সংস্কৃতি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
বর্তমানে সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে— • ওষুধের বাজারে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ
* অপ্রয়োজনীয় টেস্ট ও কমিশন বাণিজ্য বন্ধ
* সরকারি হাসপাতালে মানসম্মত ও মানবিক সেবা নিশ্চিত করা
* রোগীদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করা
* চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনা
* স্বাস্থ্যখাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করা
ভালো মানুষ সব পেশাতেই আছেন, ডাক্তার সমাজেও আছেন অসংখ্য নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক। তাঁদের সম্মান অটুট রেখেই স্বাস্থ্যখাতের অসঙ্গতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলা প্রয়োজন। কারণ 
 শুধু সময়ের দাবি নয়, এটি সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার।
 

লেখক : সিনিয়র শিক্ষক ইংরেজি, আমির মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ।