হাওরের বড় বড় ঢেউ সুনামগঞ্জের মানুষের কাছে আফাল হিসেবে পরিচিত। আবহমান কাল ধরে হাওরের এই আফাল মূর্তমান এক আতঙ্কের নাম।
আফালের তান্ডবে প্রতি বছর ভিটেমাটি ছাড়া হচ্ছেন হাওর পাড়ের শত শত মানুষ। ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে গিয়ে নৌকা ডুবিতে প্রাণ যাচ্ছে নারী শিশুসহ বিভিন্ন বয়সে লোকের। আফালের কবল থেকে গ্রামীণ জনপদের জীবন ও সম্পদের রক্ষায় টেকসই উন্নয়ন ব্যবস্থাসহ সাধারণের মধ্যে জনসচেতনতা সৃষ্টিকে সমাধান হিসেবে দেখছেন হাওরের সচেতন মহল।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার করচার হাওরের তীরবর্তী গ্রাম বাহাদুরপুর। পেশায় বেশিরভাগ জেলে সম্প্রদায়ের এই গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ নিন্ম ও মধ্যবিত্তের। বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর ঢেউয়ের আঘাতে গেলো ১ যুগের ব্যবধানে বাহাদুরপর গ্রামের হাওরে বিলীন হয়েছে অসংখ্য বসতভিটা। ঘরবাড়ি হারিয়ে এলাকা ছাড়া হয়েছেন অনেক পরিবার।
সম্প্রতি টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলের সাথে যোগ হয়েছে আফাল ঢেউ। হাওরের পাড়ের অবস্থান হওয়ায় সরাসরি ঢেউ আঘাত করছে ছোট্ট এই গ্রামমটিতে। দিনের চেয়ে রাতে ঢেউয়ের ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। ঢেউয়ের আঘাতে ইতিমধ্যে পেশায় মৎস্যজীবী পরিবারের অন্তত ২০ টি ঘর হাওরে বীলিন হয়ে হয়ে গেছে। আফলের কবলে ঘরবাড়ি ভেঙ্গে যাওয়ার মানবেতর দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। বাঁশ আর কচুরিপানা দিয়ে ঘরের চারপাশে কোনো রকম ‘আড়ি’ (বাঁধ) দিয়ে বসতভিটা ধরে রাখার চেষ্টা করছে কিছু পরিবার। প্রতিটি গ্রামে স্থায়ী সরকারি প্রতিরক্ষা দেয়াল (ওয়েভ প্রটেকশন ওয়াল) নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। পাহাড়ি ঢল ও ঢেউয়ের আঘাতে ঘরবাড়ি বীলিন হয়ে নিঃশ^ পরিবারগুলোর আর্তনাদ কেউ শুনছে না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন তারা। বসতভিটা হারিয়ে মাথা গুজার ঠাঁই হচ্ছে না। এ অবস্থায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চরম বিপাকে আছেন ঘরের কর্তারা। ঢেউয়ের আঘাত থেকে ঘরবাড়ি বিদ্ধস্ত হওয়া থেকে পরিত্রান চচ্ছেন গ্রামের বাসিন্দারা।
বাহাদুরপুর গ্রামের সুষমা বর্মন,গত তিন দিন ধরে ঘুমাতে পারছিনা। ঢৈউয়ে ঘরের অর্ধেক হাওরে চলেগেছে। কোন সময় বাকি অংশ চলে যায় সেই ভয়ে আছি। ঘর যদি ভেঙ্গে যায় ছেলে সন্তান নিয়ে কই থাকবো। সন্তানদের নিয়ে কোথায় যাবো। আমাদের মতো মানুষকে কে আশ্রয় দিবে।
গ্রামের নিখিল বর্মন বলেন, আমাদের মতো গরিব মানুষদের কে খবর রাখে। প্রতিবছর অনেক বাড়ি ঘর আফালের তান্ডবে বিনীন হয়ে যাচ্ছে । কিন্তু আমাদের বাড়িঘর রক্ষায় সরকারের এগিয়ে আসছেনা। অনেকই বাড়িঘর হারিয়ে ঢাকায় চলেগেছে। ঢেউ প্রতিদিনই ঘরবাড়ি ভাঙ্গছে। এখনই যদি ভাঙ্গন রক্ষায় বিহীত ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয় তাহলে এই বর্ষায় অনেক ঘর হাওরে বিলীন হয়ে যাবে।
আফালের এই দৃশ্য কেবল বাহাদুর গ্রামের নয়। এটি পুরো সুনামগঞ্জ হাওর এলাকার। হাওর পাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ গ্রামগুলো আফালের ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জীবন ও সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাই হাওরের টেকসই উন্নয়নের পাশাপাশি সাধারণে মধ্যে জনসচেতনার সৃষ্টিতে সরকারের সুদৃষ্টি হাওরবাসীর অধিকার আদায়ে সোচ্চার সংগঠনের নেতারা।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক একে কুদরত পাশা বলেন, হাওরের এই জনবসতী অনেক বছরের। প্রকৃতি এতোদিন ধরে হাওরের মানুকে রক্ষা করে আসছিলো। এক সময়ে হাওরে অনেক জলজ উদ্ভিদ ছিলো, তাই বষায় ঢেউ কম হতো। হাওরে আগে হিজল,করচ বাগ ছিলো। হাওর পাড়ের উদ্ভিদ ছিলো। এসব এখন আর নাই। মানুষ হাওরের গভীরে ঝুঁকি নিয়ে বসতি করে। হাওরকে হাওরের মতো থাকতে দিতে হবে। মানুষকে সচেতন করতে হবে। হাওর ভরাট করে জনবসতি করতে দেয়া যাবে না। হাওর ও নদী তীরে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি নারী ও শিশুর জন্যে অনেক ঝুঁকির। তাছাড়া প্রতিবন্ধী ও বয়স্কদের জন্য আরও ঝুকির। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সম্পদ ও জীবনের ঝুঁকি থাকে। সরকার ও ব্যক্তি উদ্যোগে হাওরের পাড়ে পাড়ে হিজল করচ গাছ রোপন করতে হবে। সরকারি অর্থায়নে ভিলেজ প্রটেকশন ওয়াল তৈরী করতে হবে। এতে আফাল থেকে গ্রামীণ বসতী রক্ষা করা যাবে।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মো. মিনহাজুর রহমান বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সরাকারি টিন বরাদ্দ দেয়া আছে। আবেদন পেলে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে টিন বিতরণ করা হবে। তাছাড়া আফাল ও নদী ভাঙ্গন থেকে বসতি রক্ষায় নানামুখী উদ্যোগ গ্রহনের কথা ভাবছে সরকার বলে জানান তিনি।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/শহীদনুর/এসডি-১৩




