কূটনীতি মানেই অনেকের কাছে প্রটোকল, আনুষ্ঠানিকতা, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব আর নির্দিষ্ট কিছু নিয়মের মধ্যে থাকা। কিন্তু একজন কূটনীতিক যখন দায়িত্বের পাশাপাশি মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করতে পারেন, তখন তার পরিচয় শুধু একজন কূটনীতিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তিনি হয়ে ওঠেন সম্পর্কের সেতুবন্ধনকারী। সিলেটে ভারতের সহকারী হাইকমিশনার অনিরুদ্ধ দাস তেমনই একজন মানুষ।
সিলেটে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই অনিরুদ্ধ দাসকে দেখা গেছে ভিন্ন এক পরিচয়ে। কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনের মানুষের সঙ্গে আন্তরিক যোগাযোগ তৈরি করে চলেছেন। তার আচরণে যেমন রয়েছে সৌজন্য, তেমনি কথাবার্তায় রয়েছে সহজ-সরল আন্তরিকতা। ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সিলেটের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছেন একজন সজ্জন ও ভদ্র মানুষ হিসেবে।
একজন কূটনীতিকের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তার রাষ্ট্রীয় পরিচয় নয়; মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার দক্ষতাও তার গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। অনিরুদ্ধ দাস সেই জায়গাটিতেই যেন আলাদা। তিনি জানেন কীভাবে একজন মানুষকে সম্মান দিতে হয়, কীভাবে অপরকে আপন করে নিতে হয় এবং কীভাবে ভিন্ন মত ও ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়।
সিলেটের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল বরাবরই সমৃদ্ধ। এই অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে ভারতের, বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের রয়েছে দীর্ঘদিনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আত্মিক যোগাযোগ। ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, সাহিত্য, সংগীত—অনেক ক্ষেত্রেই রয়েছে অভিন্নতার ছাপ। এই সম্পর্ককে আরও উষ্ণ ও প্রাণবন্ত করার ক্ষেত্রে একজন কূটনীতিকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনিরুদ্ধ দাসের কর্মকাণ্ডে সেই আন্তরিকতার প্রতিফলন দেখা যায়।
তার উপস্থিতি শুধু কূটনৈতিক অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনেও তার অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ তাকে আলাদা করে চেনার সুযোগ তৈরি করেছে। তিনি মানুষের কথা শোনেন, তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সম্পর্ককে গুরুত্ব দেন। এ কারণেই হয়তো তাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক ধরনের আন্তরিকতা ও ভালো লাগা।
কূটনীতি মূলত রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু সেই রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ভিত শক্ত হয় মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ওপর। দুই দেশের পতাকা পাশাপাশি উড়তে পারে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বৈঠক হতে পারে, নানা চুক্তি ও সমঝোতা হতে পারে—কিন্তু মানুষের হৃদয়ে যদি বন্ধুত্বের জায়গা তৈরি না হয়, তাহলে সেই সম্পর্ক পূর্ণতা পায় না। অনিরুদ্ধ দাসের মতো একজন মানবিক কূটনীতিক সেই জায়গাটিতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
তার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো সংস্কৃতির প্রতি তার আগ্রহ। সংস্কৃতি এমন একটি শক্তি, যা কোনো সীমান্ত মানে না। একটি গান, একটি কবিতা, একটি নাটক কিংবা একটি শিল্পকর্ম কখনো কখনো এমন বন্ধন তৈরি করতে পারে, যা দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনাতেও সম্ভব হয় না। তাই একজন কূটনীতিকের সাংস্কৃতিকমনস্কতা দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্ককে আরও গভীর করার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
অনিরুদ্ধ দাসকে যারা কাছ থেকে দেখেছেন, তাদের অনেকের কাছেই তার সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি একজন ভালো মানুষ। পদমর্যাদা কিংবা দায়িত্বের বাইরে একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব আসলে প্রকাশ পায় তার ব্যবহার ও আচরণে। মানুষকে সম্মান করা, অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, হাসিমুখে কথা বলা এবং সম্পর্ককে মূল্য দেওয়া—এই সাধারণ গুণগুলোই একজন মানুষকে অসাধারণ করে তুলতে পারে।
সিলেটের মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ তাই নিছক কূটনৈতিক যোগাযোগ নয়; এটি এক ধরনের সামাজিক সম্পর্কেরও প্রকাশ। আর এই সম্পর্ক যত গভীর হবে, বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষের পারস্পরিক বোঝাপড়ার জায়গাটিও তত শক্তিশালী হবে।
আজকের পৃথিবীতে কূটনীতি শুধু বৈঠকের টেবিলে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক কূটনীতি মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককেও গুরুত্ব দেয়। সাংস্কৃতিক কূটনীতি, জনসম্পৃক্ততা এবং পারস্পরিক যোগাযোগ এখন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অনিরুদ্ধ দাসের মতো একজন কূটনীতিক যখন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষের সঙ্গে সহজভাবে মিশে যান, তখন সেটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক কূটনীতিরই একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত।
সিলেটের মাটিতে তার পথচলা আরও দীর্ঘ হোক। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তার সম্পৃক্ততা আরও বিস্তৃত হোক। তার সৌজন্য, আন্তরিকতা ও মানবিকতার মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারতের বন্ধুত্ব আরও দৃঢ় হোক—এটাই প্রত্যাশা।
কারণ শেষ পর্যন্ত কূটনীতির সবচেয়ে সুন্দর ভাষা কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি নয়; মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আন্তরিকতাই সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা।
আর সেই ভাষায় অনিরুদ্ধ দাস যেন সিলেটে লিখে চলেছেন এক সুন্দর সম্পর্কের গল্প—কূটনীতির সীমানা পেরিয়ে, মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে।
আকাশ চৌধুরী : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।




