বহুল কাঙ্খিত সিলেট জেলা বিএনপির কাউন্সিল আজ মঙ্গলবার (২৯ মার্চ) সমাপ্ত হল। উৎসাহ নিয়ে সারা জেলার ১৮টি সাংগঠনিক ইউনিটের কর্মীরা প্রত্যক্ষ ভোটে নিজেদের আগামীর নেতৃত্ব নির্বাচন করেছেন। ১৯৩ ভোটের ব্যবধানে সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের নেতৃত্ব দিয়ে উঠে আসা এক সময়ের ডাকসাইটে যুবনেতা আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী।

বলা যায় নিরব ভোট বিপ্লব হয়েছে তার ক্ষেত্রে। যেখানে সভাপতি পদের দাবীদার অনেক সিনিয়র স্থানীয় নেতৃত্ব ছিল সেখানে ২ বছর আগের আহবায়ক কমিটিতে জনাব কাইয়ুমকে বেশ নিচের সারিতে সদস্যপদ দিয়ে পাঠায় দল। ঢাকা কেন্দ্রীক রাজনীতি ছেড়ে অনেকটা ব্যাকফুটে চলে যাওয়া কাইয়ুম সিলেটে আহবায়ক কমিটির সাথে চাপা অসন্তোষ নিয়ে পেছনে পড়ে থেকে কাজ করেছেন কাঁধে কাঁধ রেখে।


বিভিন্ন ইউনিট সম্মেলনে গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা রেখে মুলত তৃণমুলের আস্থায় চলে আসেন তিনি। সদ্য সাবেক সভাপতি আবুল কাহের শামিম যেখানে অনেকটা নিশ্চিন্ত ছিলেন আবারো সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার বিষয়ে সেখানে একেবারে কাইয়ুমের সভাপতি পদে ঘোষনা বেকায়দায় ফেলে দেয় শামিমকে।

সভাপতি কাইয়ুমের সাথে সাধারন সম্পাদক পদে তৃণমুলের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন সাবেক জেলা ছাত্রদল সভাপতি ও জেলা বিএনপির সাবেক নির্বাচিত সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী। তিনি অবশ্য বেশ আগে থেকেই নিজের প্রার্থীতা জানান দিয়ে আসছিলেন। এর আগে নিখোঁজ জননেতা এম ইলিয়াস আলী যেই সম্মেলনে জেলা সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন সেখানে এমরান সাংগঠনিক সম্পাদক প্রার্থী হলে পরবর্তীতে ইলিয়াসের আহবানে আলী আহমদকে ছাড় দেন তিনি। সেই বার সাংগঠনিক সম্পাদক না হতে পারলেও পরবর্তী কাউন্সিলে তিনি ঠিকই সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন সমসাময়িকদের হারিয়ে।

সিলেট বিএনপির এই পরিবর্তন নিয়ে আশাবাদী হয়ে ওঠছেন জাতীয়তাবাদী পরিবারের সর্বস্তরের শুভাকাঙ্খি সমর্থকেরা। কারন হিসেবে প্রায় সবাই বলছেন সিলেট বিএনপির কাউন্সিলে এর আগে নেতৃত্ব নির্বাচন হয়েছিল। মরহুম জননেতা এম এ হক সভাপতি ও আরিফুল হক সাধারন সম্পাদক ছিলেন। সেই কমিটির নির্বাচনে সাবেক ছাত্রনেতা বদরুজ্জামান সেলিম, আলী আহমদ, আবুল কাহের শামিমদের হারিয়ে সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচিত হয়ে ছিলেন এডভোকেট শামসুজ্জামান জামান।

এরপর অনেক বছর পরে কাউন্সিলে সভাপতি হয়েছিলেন নিখোঁজ জাতীয় নেতা এম ইলিয়াস আলী। তার সাথে সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন প্রবীন নেতা এডভোকেট আব্দুল গাফফার। আলী আহমদ পেয়েছিলেন সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ। সেদিন কাউন্সিলের দিন শহরে নিজ বাসায় কিছু সংখ্যক কর্মীদের নিয়ে মিটিং করে নিজেকে সভাপতি ও আব্দুল মান্নানকে সাধারন সম্পাদক ঘোষনা দিয়েছিলেন আবুল কাহের শামীম।

এরপর হঠাৎ করে ইলিয়াস গুম হয়ে গেলে সিলেট বিএনপি চলে যায় নবাগত নেতা খন্দকার মুক্তাদিরের হাতে। তার নিয়ন্ত্রনে সংগঠন চলে গেলে যেই কাউন্সিল হয় তাতে দুই প্যানেলে নির্বাচন হয়। ইলিয়াসের ঘনিষ্ট সহচর সাবেক সাংসদ ও জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ সভাপতি প্রয়াত দিলদার সেলিম সভাপতি পদে ও দলত্যাগী প্রভাবশালী নেতা শামসুজ্জামান একদিকে এবং আবুল কাহের শামিমের সাথে আলী আহমদ প্যানেল করে নির্বাচন করেন।

জামান প্রশ্নে যেহেতু সিলেট বিএনপির সব গ্রুপ এক, তাই দিলদার সেলিমের জনপ্রিয়তা ও গ্রহনযোগ্যতা থাকার পরেও প্যানেল ভোটে জামান ঠেকাও খেলায় উৎরে আসেন শামীম। সভাপতি ও সাধারন সম্পাদকের পদ পেয়ে যান দল থেকে সদ্য বহিস্কৃত এই দুই নেতা।

সিলেট সদরে শামিম এবং দক্ষিন সুরমায় আলি দলীয় নির্দেশনার বাইরে নির্বাচন করা এবং ৩য় স্থান দখলের করায় উভয়ে সেদিন বহিস্কার হন দল থেকে।

এরপর নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে করা হয় জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটি। কেন্দ্রীয় বিএনপি ব্যাকফুটে চলে যাওয়া কাইয়ুম চৌধুরীকে সদস্যপদ দিয়ে পাঠায় সিলেটে। ২ বছরের নিরলস শ্রমে কাইয়ুম-এমরান তৃণমুলে জায়গা করে নেন। ইলিয়াস-হক-আরিফ বিহীন সিলেট বিএনপিতে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট যা অনেকের কাছে কাজীরবাজারী সিন্ডিকেট নামে পরিচিত ভেঙ্গে আজ নতুন নেতৃত্ব পেয়েছে সিলেট বিএনপি।

শুধু সিলেটে বা বিএনপিতে নয়, দেশের গণতন্ত্রের জন্যে মডেল হতে পারে সিলেটের এই কাউন্সিল। দেখার পালা নবনির্বাচিত এই সভাপতি-সাধারন সম্পাদক নেতৃত্বে কাদের আনেন। আগের কমিটির মত ইউনিয়ন কমিটির সভাপতিদের জেলা সহসভাপতি/ উপদেষ্টা বানিয়ে সবাইকে জেলা নেতা না বানিয়ে দলকে সাংগঠনিক রূপ দানই স্বার্থক করবে তাদের এই নির্বাচিত হওয়া। শুভ কামনা তৃণমুলের সভাপতি জনাব কাইয়ুম চৌধুরী ও সাধারন সম্পাদক এডভোকেট এমরান আহমদের প্রতি।

লেখক: লন্ডনে বসবাসরত সাংবাদিক, কার্যনির্বাহী সদস্য ইউকে-বাংলা প্রেসক্লাব