সিলেটের এক গবেষক জলবায়ু পরিবর্তন উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এমন একটি গ্রীষ্মকালীন শিম উদ্ভাবন করেছেন। সম্প্রতি সিলেট বিভাগের জেলাগুলাতে ব্যাপকভাবে বেড়েছে গ্রীষ্মকালীন শিম উৎপাদন ও চাহিদার হার। গরমেও চাষ করা যায় বলে জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব থাকা সত্বেও গ্রীষ্মকালীন শিম চাষে সাফল্য মিলছে। এমনটাই মনে করছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা। গ্রীষ্মকালীন শিম উদ্ভাবকের নাম ড. মো. শহীদুল ইসলাম। তিনি সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিকৃবি) উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক। 

 


জানা যায়, ২০০৫ সাল থেকে উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের উদ্যোগে ও কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে গ্রীষ্মকালীন শিমের জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্যে গবেষণা শুরু হয়। গবেষনায় উদ্ভাবিত হয় দুটি জাতের শিম। ২০১৫ সালে এ দুটি জাত ‘সিকৃবি শিম-১’ ও ‘সিকৃবি শিম-২’-কে কৃষক পর্যায়ে উৎপাদনের জন্য নিবন্ধন দেয় কৃষি মন্ত্রণালয়। 

 

শীতকালীন সবজি হিসেবে দেশে শিমের পরিচিতি রয়েছে। আমিষ, শ্বেতসার, আঁশ, স্নেহ, ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম, লৌহ ও মানবদেহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য উপাদান রয়েছে শিমে। এ সবজির ফুল ও ফল ধারণ দিনের দৈর্ঘ্যের (স্বল্পদৈর্ঘ্য) উপর নির্ভরশীল। এছাড়া ফসলটি আলো সংবেদনশীল হওয়ায় সাধারণত শীতকালেই এর চাষাবাদ সম্ভব ছিল বলে জানিয়েছেন কৃষিবিজ্ঞানীরা। তবে জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে সারাবছরই অস্বাভাবিক গরমের পাশাপাশি দিনের দৈর্ঘ্যেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। সেই সঙ্গে ঋতু পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে শিম চাষাবাদের উপযোগী করে তুলেছেন সিকৃবির উদ্ভাবক অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল ইসলাম। 

 

এ সর্ম্পকে তিনি বলেন, গ্রীষ্মকালীন শিম অত্যন্ত পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ তাপ সহিষ্ণু জাত। এর চাষপদ্ধতিও তুলনামূলক সোজা এবং কম খরচেই চাষ করা যায়। সাধারণত ৭৫-৮০ দিনের মধ্যেই ফসল পাওয়া সম্ভব। গরমের সময় এ শিমের চাষ করে ব্যাপকভাবে লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা। 

 

জলবায়ু পরিবর্তন উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এ শিম চাষ কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন তিনি। 

 

কৃষকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, সিলেট অঞ্চলে মোজাইক ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। এ ভাইরাস দমন করা অত্যন্ত জরুরি। ফসল এ ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হলে গাছ বা আক্রান্ত অংশ পুঁতে বা আগুনে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। এছাড়া আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে অন্যান্য পোকার আক্রমণের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে; তবেই কৃষকরা অধিক লাভবান হতে পারবেন।

 

সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা সুব্রত দেবনাথ জানান, গ্রীষ্মকালে যেহেতু সবজি কম থাকে, তখন গ্রীষ্মকালীন শিম চাষ সবজির ভাণ্ডারে একটা গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। গ্রীষ্মকালীন শিমের জাত কৃষক পর্যায়ে ভালো সাড়া ফেলেছে। এর ফলনও ভালো। তবে বীজের প্রাপ্তি তথা বীজটি আরও সহজলভ্য হলে অন্যান্য কৃষকদের মধ্যে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে।

 

জলবায়ু পরিবর্তন উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিমের জাতটিকে উপযোগী উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, এ জাতের শিম গ্রীষ্ম ও বর্ষায় ফুল-ফল ধারণে সক্ষম বলে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সহজেই খাপ খাওয়াতে পারবে। 

 

হবিগঞ্জ জেলার কৃষক কবির মিয়া বলেন, এ শিমের ফলনের সাথে অন্য ফসল ফলনের তুলনা হয় না। তিনি জানান, গত বছর বাড়ির পাশের এক লোকের গ্রীষ্মকালীন শিম চাষ দেখে আগ্রহী হই। এ বছর ১৪ শতক জায়গায় চাষ করে এখন পর্যন্ত ৬০-৭০ হাজার টাকা উপার্জন করতে পেরেছি। এছাড়া এ মৌসুমে প্রায় ২ লক্ষ টাকা লাভের আশা করছেন বলে জানান তিনি। 

 

বীজের প্রাপ্যতা সম্পর্কে তিনি জানান, বীজ বাজারে পাওয়া গেলে কৃষকদের জন্য সুবিধা হত। 

 

আরেক কৃষক মো. এমরান হোসেন জানান, গত বছর ৪৫ শতক জায়গায় খুব অল্প খরচে চাষাবাদ শুরু করেন তিনি। কেবল গ্রীষ্মকালীন শিম চাষ করে তার প্রায় ২ লক্ষ টাকা লাভ হয়েছে। 

 

তিনি আরও জানান, এ বছর বন্যার কারণে চাষাবাদে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তবে গতবারের ন্যায় এবারও ভালো ফলনের প্রত্যাশা করছেন তিনি। 

 

এদিকে- জলবায়ু পরিবর্তনের উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েছে কৃষিক্ষেত্রে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলাতে পড়ছে বিরূপ প্রভাব। 

এ সংকট মোকাবেলায় করণীয় সম্পর্কে ড. মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, গবেষকদের প্রতিকূল পরিবেশ সহিষ্ণু ও দ্রুত বর্ধনশীল আরও ফসলের জাত উদ্ভাবন করতে হবে। এছাড়া বসতবাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ, বন্যা পরিস্থিতিতে ভাসমান বীজতলায় জলজ সবজি চাষ ও ধানের চারা স্থানান্তর পরবর্তী সময়ে বীজতলায় অন্যান্য ফসল চাষ করা যেতে পারে। 

 

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে শিমের বীজ সংরক্ষণ করে বিদেশে রপ্তানি করে অর্থ উপার্জন করা হচ্ছে। এছাড়া এ বীজ থেকে প্রক্রিয়াজাত খাবার তৈরিরও সম্ভাবনা আছে। তবে তা নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন আছে বলে জানান তিনি। 

 

বর্তমানে সিলেট বিভাগের জেলাগুলাতে শিমের দুটি জাতের চাষ করা হলেও, দেশব্যাপী এর বিস্তার ঘটাতে চান গবেষক। 

 

অন্যান্য জেলায় মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষা শেষে শিমের জাত দুটি কৃষকদের প্রদান ও বাজারজাত করা যাবে বলে জানান তিনি। এক্ষেত্রে তিনি সরকার, কৃষি সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও ব্যক্তিদের সহযোগিতা কামনা করেন।
 

সিলেটভিউ২৪ডটকম/জেপি