শিক্ষার্থীদের জীবনে শিক্ষক হচ্ছেন আশীর্বাদ। শিক্ষকের সুচিন্তিত নির্দেশনা আর উদার সহযোগিতায় শিক্ষার্থীরা পৌঁছে অভীষ্ট লক্ষে। তাদের কল্যাণধর্মী, স্নেহচ্ছায়ায় শিক্ষার্থীর জীবন বিকশিত হয়। সেই শিক্ষক যখন না ফেরার দেশে চলে যান, তখন তার শিক্ষার্থীদের কাছে সেটি হয় সবচেয়ে বেদনার।
এমনি একজন শিক্ষক দিরাই মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারি শিক্ষক হীরালাল দাসের প্রয়াণে শোকে স্তব্ধ তার ছাত্র, ছাত্রীবৃন্দ। হীরালাল দাস ইংরেজি বিষয়ে একজন দক্ষ শিক্ষক ছিলেন। সুনামগঞ্জের দিরাই পৌরসভার মজলিশপুর গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন তিনি।
প্রিয় শিক্ষকের মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি আবেগঘন স্ট্যাটাসে শক্তি দাস লিখেন, স্যার আপনার মত মহানুভব আর আমি দেখিনি কত মানুষের জীবন প্রদীপ নিজ হাতে জ্বেলে দিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করেছেন তা বলে শেষ করা যাবে না। আমার জীবনের আপনার অবদান অসামান্য স্যার। আপনার মত জ্ঞানী, গুনী, উদার, বিনয়ী শিক্ষককে কখনোই ভুলা যাবে না আমার মত অনেকেরই অন্তরেই আপনি বেঁচে থাকবেন স্যার আজীবন। এমন অভাগা আমি আপনাকে শেষ দেখাটুকু দেখতে পারলাম না স্যার।
ইন্দ্রজিৎ রুবেল লিখেন, দিরাই উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শ্রদ্ধেয় হীরালাল দাস স্যার ছিলেন ইংরেজির বেসিক গঠনের কারিগর। তুলনামূলকভাবে ইংরেজিতে যাদের দূর্বলতা বেশি, স্যারই ছিলো তাদের শেষ ভরসা।
ছোটবেলা থেকে স্যারের সুনাম শুনতে শুনতে যখন কলেজ পর্যন্ত এলাম, স্যারের কাছে পড়ার ইচ্ছেটা পূর্ণ হলো। ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে ৪ মাস স্যারের কাছে পড়ার সুযোগ হয়েছিল। এই অল্পসময়ে উনার কাছ থেকে যতোটুকু শিখেছি, তা দিয়েই বাকিটা পথ অতিক্রম করে এসেছি।
একদিন স্যার আমাদের কমপ্লিটিং সেনটেন্স পড়াবেন। পাঁচটা ইনকমপ্লিট সেনটেন্সই "Love" নামক একটা শব্দ যুক্ত ছিলো। আমরা বন্ধুরা ভাবতেছিলাম, স্যার হয়ত এইটা পড়াতে লজ্জা পাবেন। আর লজ্জায় হয়ত যথোপযুক্ত শব্দ নাও বসাতে পারেন! স্যার লজ্জা পেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু এতো সুন্দর সুন্দর শব্দ দিয়ে সেনটেন্স গুলা পূরণ করলেন যা দেখে অবাক হয়েছিলাম। স্যারের শব্দচয়ন খুব মধুর ছিলো।
স্যারের কাছ থেকে আমাদের ব্যাচের বিদায়কালে স্বারক হিসেবে স্যারের একটা ছবির সাথে কিছু ছন্দযুক্ত লাইন ছিলো। স্যার দেখে হাসলেন, কিছুটা কাঁদলেন।
পরে একদিন উনার বাসায় গেলাম। লাইনগুলো কে লিখেছে জিজ্ঞেস করতেই আমি মাথানিচু করে চুপ থাকলাম। স্যারের বুঝতে পেরে বললেন, "প্রতিটা লাইনের প্রতিটা শব্দই আমার ভালো লেগেছে। তবে তুমি আমাকে আপনি সম্মোধন না করলেও পারতে। কাছের মানুষদের কেউ আপনি সম্মোধন করে না। তুমি হয়ত আমারে সম্মান দিতে গিয়া আপনি লিখেছো।" স্যারের এই কথা আমাকে ভাবিয়েছিল। মানুষ এতো মহৎ হতে পারে!
সুমন বিশ্বাস তার হৃদয় বিদায়ক পোস্টে লিখেন, দিরাই উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শ্রদ্ধেয় শিক্ষক হীরালাল দাস।যিনি ছিলেন ইংলিশ গ্রামারের শেষ চিকিৎসক খ্যাত। স্যারের নিজের লেখা একটি ইংলিশ গ্রামারও রয়েছে। এটা হয়তো অনেকেই জানেন না। ইংলিশ গ্রামারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে তিনি ছিলেন এক অনন্য শিক্ষক। ইংলিশ গ্রামারের শিক্ষক মানেই হীরালাল স্যার। যার খ্যাতি পুরো দিরাই জুড়ে।
আমার ইন্টারমিডিট লাইফটায় স্যারের কাছে পড়েছি। স্যার যতটা পড়াতেন তার চেয়ে বেশি স্নেহ করতেন। স্যারের অগনিত স্টুডেন্টরা আজ বিসিএস ক্যাডার-নন ক্যাডার। স্যার যখন মাঝে মাঝে পড়ানোর ফাঁকে উনার স্টুডেন্টদের কথা খুব গর্বের সাথে বলতেন, আমার স্টুডেন্টরা আজ বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছে। কেউ কেউ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, এ্যাডভোকেট, ব্যাংকার। তখন যেন স্যার অনেক আনন্দবোধ করতেন। এমন স্যারের স্টুডেন্টরা তো ভালো পর্যায়ে নিয়োজিত হবে এটাই হওয়ার কথা কিন্তু ক'জন স্টুডেন্ট স্যারের কথা মনে রেখেছে সেটা বিরল। স্যারের জীবদ্দশায় ক'জন ই বা স্যারকে স্মরণ করেছে তা আমার জানা নেই। একজন শিক্ষাগুরু হিসেবে স্যার যতটা তার স্টুডেন্টদের কাছ থেকে ডিজার্ভ করেন, স্যার সেটা পাননি।আমরা তা দিতে পারিনি।এই স্বার্থের দুনিয়ায় আমরা আমাকেই নিয়ে ব্যস্থ।
দোল পূর্নিমার এক দিনে স্যারের সাথে আমাদের ব্যাচের বিদায়ি অনুষ্ঠান ছিল। আমাদের ব্যাচের সবাই মিলে স্যারের জন্য একটি ধুতি পাঞ্জাবি উপহার দেই। স্যার সেগুলো পরিধান করে আমাদের আবির মাখিয়ে আশির্বাদ করেছিলেন। আমরা স্যারের পা ছূঁয়ে প্রণাম করে আশির্বাদ নিয়েছিলাম। এক বান্ধবীর বাড়িতে ভোজের আয়োজন হয়েছিল। সবাই মিলে সে ভোজন উপভোগ করেছিলাম স্যারকে নিয়ে। ঘিয়ে কালার পাঞ্জাবি আর ধূতি পড়ে স্যার আমাদের সামনে এসে বসেছিলেন। ধুতির এক মাথা ছিল স্যারের এক হাতে গোজা। সাদা চুল, উজ্জ্বল বর্ন গায়ের রং। স্যারকে ভারি সুন্দর লাগছিল। যেন শ্রদ্ধার এক অলৌকিক মূর্তি আমাদের সামনে বসে আছেন। সেই যে স্যারকে পা ছূঁয়ে প্রনাম করেছিলাম, আজও উনার আশির্বাদ আমাদের সঙ্গেই আছে কিন্তু স্যার আর আমাদের মাঝে নেই। ভাবতেই জলে চোখ ভিঁজে যাচ্ছে।
আমাকে স্যার সুমন বলে ডাকতেন। তুমি বলে সম্মোধন করতেন। পরক্ষনেই আবার নামটি ভুলে যেতেন। মনে করিয়ে দিলে স্যার আবার সে নামেই ডাকতেন। আমার নিজের লজ্জা লাগতো স্যারের তুমি সম্মোধনকে। আমাকে নয় সবাইকেই স্যার তুমি সম্মোধন করতেন।স্নেহপরায়ণ এই ডাক আজ এখনও আমার কানে ভেঁসে উঠে কিন্তু স্যার আজ আমাদের মাঝে নেই। চিরতরে পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার জগতে।
পরপারে ভালো থাকবেন স্যার।আপনার একজন স্নেহ ভৎসল ছাত্র হিসেবে আজ খালি হাতে আপনাকে বিদায় জানানো ছাড়া আর কিচ্ছুটি করার নেই।শূন্য হাতে প্রার্থনা কতটা কার্যকর হয় আমি জানিনা, স্যার। তবে পরপারে যেখানেই থাকুন,ভালো থাকুন। এই প্রার্থনাই আমাদের শেষ সম্বল।
দিরাই পৌরসভার দোওজ গ্রামের সন্তান মৌলবীবাজার সরকারি কলেজের লেকচারার পিংকু রায় বলেন, আমাদের প্রাণের ছোট্ট মফস্বল শহরটিকে যারা আলোকিত করেছেন তাদের মধ্যে হীরালাল স্যার অন্যতম। প্রিয় শিক্ষাশুরুর এই প্রয়াণ দিরাইবাসির জন্য এক অপূরনীয় ক্ষতি। ঈশ্বর যেন উনাকে স্বর্গবাসী করেন। স্যার খুব সহজ করে ইংলিশ গ্রামারের খুটিনাটি বুঝাতেন যার গুরুত্ব আমি শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করার পরে ভালভাবে বুঝতে পারি আর তখন থেকে আমিও চেষ্টা করছি আমার ছাত্রছাত্রীদের মাঝে তা ছড়িয়ে দিতে। আর এইভাবেই আমার এবং আমার মতো হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীদের মাধ্যমে প্রিয় শিক্ষাগুরুরা অমরত্ব লাভ করেন।
উল্লেখ্য, দিরাই মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারি শিক্ষক হীরালাল দাস গত শুক্রবার রাতে বার্ধক্য জনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। এদিকে প্রিয় শিক্ষকের মৃত্যুর খবরটি জানাজানি হবার পর থেকে প্রাপ্তন ছাত্রদের আবেগঘন স্ট্যাটাস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/এইচপি/এসডি-১২




