কামরানের শহর সিলেটে ভোট ২১ জুন। এই শহরে পঞ্চমবারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে সিটি করপোরেশন নির্বাচন। আগের সব নির্বাচনেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। এরমধ্যে দুই বার বিপুল ভোটে মেয়রও নির্বাচিত হয়েছেন। মানুষ তাকে আপন করে নিয়েছিলো নিজের মতো করে। এজন্যই 'গণমানুষের নেতা' থেকে হয়ে উঠেছিলেন জনতার কামরান।  তাঁর নামের সঙ্গে সিলেট প্রতিশব্দের মতো! আজ তাঁর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে কামরানের অভাব অনুভব করছেন ভোটের শহর সিলেটের মানুষ।


কামরানের এই মৃত্যু বার্ষিকীর সময়ে তাঁর শহরে এখন ভোটের আমেজ। প্রথমবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে কামরানহীন সিলেটে সিটি করপোরেশন ভোট।



সিলেটের মানুষের জন্য বেদনাদায়ক দিন আজ ১৫ জুন । এদিন সিলেট হারিয়েছে তাঁর আপন মানুষকে। মাত্র ২২ বছর বয়সে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার ভার কাধে তুলে নেওয়া আওয়ামী লীগ নেতা বদরউদ্দিন আহমদ কামরান সিলেটবাসীর সুখ-দুঃখের সাথী হয়ে থেকে হয়ে উঠেছিলেন 'গণমানুষের নেতা'। মৃত্যুর তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো সিলেটবাসীর হৃদয়ে রয়ে গেছেন তিনি।


২০২০ সালের ১৫ জুন ভোরে একটি দুঃসংবাদ শুনে ঘুম ভাঙে সিলেটবাসীর। ঢাকা থেকে খবর আসে আসে কামরান আর নেই। সিলেটের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা, জনতার কামরান খ্যাত বদরউদ্দিন আহমদ কামরানকে এই দিনে কেড়ে নেয় বিশ্ব কাঁপানো করোনা ভাইরাস। তিনি সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও দলের কেন্দ্রীয় সদস্য ছিলেন। এছাড়া সিলেট সিটি করপোরেশনের দুবারের মেয়র।


তরুণ অভিনেতা ও কবি মিনহাজ ফয়সল বলেন, ‘এই শহরে ভোট হচ্ছে। ভোট এলেই কিছু কমন দৃশ্য আমরা দেখতাম। সম্প্রীতি ও সৌহার্দের দারুণ মুর্হুত তৈরী হতো। এই শহরের প্রিয়নাম বদর উদ্দিন কামরান। এই শ্লোগানটা খুব বেশী মনে পড়ছে এই সময়ে। সত্য বলতে এই শহরে কামরান ছিলেন আপাদমস্তক একজন সজ্জন রাজনীতিবিদ। দলের নেতাকর্মী তো বটেই, প্রতিপক্ষসহ সব মানুষকে তিনি সম্মান দিতেন। রাজনৈতিক দুর্নীতি ও দূষণ, অহংকার তাকে কলুষিত করেনি। নগরীর রিকশাওয়ালা, পানের দোকানদার থেকে পত্রিকার হকার সবাই তাঁর কাছে মানুষের মর্যাদা ও সম্মান পেতেন। কাউকে তুচ্ছজ্ঞান করতেন না। অথচ আজকাল রাজনীতিতে নেতার সঙ্গে কর্মীদের মনে হয় প্রভু আর দাসের সম্পর্ক।’


স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন উদ্দীপ্ত সিলেটের সভাপতি আবিদ কাওসার বলেন, ‘আসলে সিলেটবাসী এখনো আরেকজন কামরানের অপেক্ষায় আছেন। যিনি কামরানের মতোই সবাইকে বুকে জড়িয়ে নিবেন। সুখে দুঃখে মানুষের পাশে থাকবেন। যেকোনো আপদে-বিপদে যাকে আমরা পাশে পাব।’


কামরানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গত কয়েকদিন ধরেই নগরীতে নানা কর্মসূচি পালন করছেন তার অনুসারীরা। তার দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। মহানগর আওয়ামী লীগ  বাদ যোহর হযরত শাহজালাল (র.) দরগাহ মসজিদের মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে।


গত বছরের ৫ জুন সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজের ল্যাবে নমুনা পরীক্ষায় ৬৯ বছর বয়সি কামরানের করোনার সংক্রমণ ধরা পড়ে। তার আগে ২৭ মে তার স্ত্রী আসমা কামরান কোভিড-১৯ আক্রান্ত হন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ৭ জুন কামরানকে ঢাকায় নিয়ে এসে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাকে প্লাজমা থেরাপিও দেওয়া হয়েছিল। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৫ জন ভোরে মারা যান সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র কামরান। যিনি দীর্ঘদিন সিলেট পৌরসভার চেয়ারম্যানেরও দায়িত্বে ছিলেন।


একনজরে কামরান
বদরউদ্দিন আহমেদ কামরান ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় ১৯৭৩ সালে তিনি প্রথমবার সিলেট পৌরসভার ওয়ার্ড কমিশনার নির্বাচিত হন। ১৯৯৫ সালে হন সিলেট পৌরসভার চেয়ারম্যান। ২০০২ সালে সিলেট পৌরসভা সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর মেয়র মনোনীত হন।

২০০৩ সালে সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে জিতে মেয়র পদ ধরে রাখেন তিনি। ২০০৭- ০৮ সালে সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আরো অনেক রাজনীতিবিদের মতো কামরানকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সে সময় জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা কামরান কারাগারে থেকে নির্বাচন করেও বিপুল ভোটে জয়ী হন। ২০১৩ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে হেরে গিয়ে মেয়র পদ হারান কামরান। এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি লড়েছিলেন, কিন্তু জয়ী হতে পারেননি।


১৯৮৯ সাল থেকে সিলেট শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০০২ সালে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি হন কামরান। সেই দায়িত্ব তিনি সামলেছেন প্রায় দেড় যুগ। ২০১৬ সালে আওয়ামী লীগের সম্মেলনে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য পদ পাওয়া কামরান মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত একই পদে ছিলেন।


সিলেটভিউ২৪ডটকম/ মাহি