বিদেশি কোন রাষ্ট্র যদি সত্যিকারের কোন ভাল কাজ তাদের নিজেদের জন্যই করে, তবে আমারাও তা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে যাচাই-বাছাই করে অনুসরন করতে কোন দ্বিধা নেই, যদি আমাদের নিজ দেশের জন্য নিশ্চিৎভাবে এবং সত্যিই তা মঙ্গলজনক হবে বলে প্রতিয়মান হয়। কিন্তু সর্বক্ষেত্রে কোন্ দেশ কি করল, তাতে আমাদের কিছু যায়-আসে না। আমরা কাউকে অন্ধভাবে অনুসরন করব কেন? বরং আমরা আত্মবিশ^াসী হবঃ অন্যরা আমাদেরকে অনুসরন করুক।

আমাদের দেশে “রাষ্ট্র-সংস্কার” ও “বাক-স্বাধীনতা” নিয়ে বেশ কিছুদিন থেকে অনেক কিছুই  শুনে আসছি। এ ক্ষেত্রে দেশে-বিদেশে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে বিশ^বিদ্যালয় পর্যায়ে ৪৫ বছরের শিক্ষকতার (একমাত্র সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়েই এর প্রতিষ্ঠ-লগ্ন থেকে একটানা ২৯ বছর) অভিজ্ঞতা নিয়ে আমি এ ক্ষুদ্র মানুষটি জাতীয় স্বার্থে কয়েকটি প্রয়োজনীয় প্রস্তাব দিচ্ছি। অবশ্য আগেও অনেকবার দিয়েছি, কিন্তু কোনটাই কোন কাজে আসে নি। কারণ হিসেবে আমি আবিষ্কার করেছি, সরকারের মন্ত্রী-মিনিষ্টারগণ টাকা মারার ধান্দায়, এবং কোন্ দিন কোন্ বিদেশে সফরে যাবেন,এই ধান্দায় আমার কষ্টের লিখাগুলো পড়ার কোন সুযোগ পান নি উনারা।


নবাগত সরকার! আপনারা তো “রাষ্ট্র-সংস্কার” ও “বাক-স্বাধীনতা” নিয়ে বেশ চিল্লাচ্ছেন। তবে আপনারা ২ মাসের মধ্যে এ সংস্কারগুলো করেন, আমি অবশ্যই তা বলছি না, এবং বলবও না। সময় নেন্, চিন্তা করুন, একটা একটা করে আরম্ভ করুন, এক দিন সবগুলোই সম্পন্ন হবেঃ
১/ বছর দেড়েক আগে ক্লাশ নাইন-টেন্ এর একটি ইংরেজি বই কিভাবে যেন আমার হাতে এসেছিল। দেখলাম, গোটা বইয়ে ভুলে ভরা ইংলিশ! এমন কি, টেক্সটবুক বোর্ড এর চেয়ারম্যানের ভূমিকা লেখাতেও রয়েছে ভুল! আমার দৃঢ় বিশ^াস, অন্যান্য সকল ক্লাশের ইংরেজি বইয়েও একই রকম ভুল আছে। আমি কষ্ট করে দীর্ঘ দু’টো কলাম পর পর লিখেছিলাম শিক্ষামন্ত্রী বরাবর। কোন ফীডব্যাক পাই নি। আর, অপশিক্ষিত/কুশিক্ষিত বুদ্ধিজীবিরা অন্যান্য বইয়ের তো ১২ টা বাজিয়েছেনই। এ নিয়ে আন্দোলন-লেখালেখিও হয়েছে অনেক। লজ্জা, লজ্জা! উনাদের ছেলেমেয়েরা তো পড়ে বিদেশে। অতএব, গরীবের সন্তানরা গোল্লায় যাক! চাকুরী না পাক! বেকার থাকুক। দেশের টাকায় বিদেশ থেকে কারিগর/শ্রমিক আনা হউক!
২/ ঈশ^রচন্দ্র গুপ্তের ভাষায়ঃ “মা তুমি কল্পতরু, আমরা সব পোষা গরু”। রাণি ভিক্টোরিয়া কি ইংল্যাÐের টাকায় কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজ বানিয়েছিলেন? একই প্রশ্ন কারমাইকেল কলেজ নিয়ে? একই প্রশ্ন কার্জন হল নিয়ে, বা অন্য এ রকম সব রাস্তা বা স্থাপনা নিয়ে? সিলেটের কীন ব্রিজ কি কীন সাহেব নিজের টাকায় বানিয়েছিলেন? হার্ডিন্জ্ ব্রিজ কি বৃটেনের টাকায় বানানো হয়েছিল? আরো কত কি? এ সব নাম পরিবর্তন করতে হবে, দেশীয় নাম দিতে হবে। স্বাধীন দেশে পরাধীনতার শিকল বাঁচিয়ে রাখতে আমাদের লজ্জা লাগে না?
৩/ পোষ্ট আফিসের চিঠির সব লাল বাক্সের ডিজাইন ও রং বদলাতে হবে। যে দেশেই বৃটিশ গেছে, সে দেশেই এই লাল বাক্স। আমাদের সকল রেল স্টেশনের লাল ইটের দালান-দেয়াল অন্ততঃ সবুজ করতে অসুধিা কোথায়? সিলেটের এমসি কলেজের বৃটিশ-নির্মিত ছাত্রাবাস বছর-দশেক আগে পুড়ে গিয়েছিল, আমাদের কর্তা-ব্যক্তিরা বল্লেনঃ বৃটিশ কায়দায় আবার বানাতে হবে, হায় রে আমাদের পরাধীন ঔপনিবেশিক মানসিকতা!
৪/ আমাদের জাতীয়সঙ্গীত বদলাতে হবে; কারণ, ওটাতে বাংলাদেশের নাম একবারও নেই। আমাদের স্বাধীনতার স্থপতিদের কারো নামও ওটাতে নেই? এক ভাষার হলেই কি একজন বিদেশি লেখকের কোন একটি “লিখা” হবে আমাদের আলাদা স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের জাতীয়সঙ্গীত? তা হলে তো মধ্যপ্রাচ্যের সকল আরব দেশের জাতীয়সঙ্গীত এক হতে পারত, যেহেতু তাদের সকলের ভাষাই আরবী। আর, বিদেশে অধ্যপানার সময় আমি বিদেশি অধ্যাপকদের বুঝাতেই পারি নি যে, রবী ঠাকুর ছিলেন বাঙ্গালি কবি! অরও মারাত্মক=আমি বুঝাতেই পারি নি ওদেরকে যে, আমাদের বাঙ্গালি কবিই নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন; ওরা বলেঃ নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন ঐ ইÐিয়ান কবি, বাংলাদেশের নয়, এ জন্য ওরা আমাকে মিথ্যাবাদী আহ্মকও ডেকেছে। চরম লজ্জা হয়েছে আমার।
৫/ আমরা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক। আমাদের কোন রাজাও নেই; আর, আমরা কারো প্রজাও নই। তাই, আমাদের দেশের নাম হবেঃ “জন-গণতন্ত্রী বাংলাদেশ”; আর, সরকারের নাম হবেঃ “জন-গণতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার”। কবে কে করেছে ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ? আর, আজও আমরা তা নিয়ে বসে আছি। মনে রাখতে হবে, আমাদের কোন রাজ-দরবার নেই। আছে দু’টি ভবনঃ একটি বঙ্গভবন, অন্যটি গণভবন। রাজপথের নাম হবে “জনপথ” বা “গণপথ”। রাজধানীর নাম হবে দেশের “আত্মানগর” বা “মুখ্যনগর” বা এর চাইতে উত্তম একটি নাম। দেশে তো আর ভাষাবিদদের আকাল পড়ে যায় নি যে, একটা নামও বের করা যাবে না?
৬/ পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের নাম হবে “বিদেশমন্ত্রণালয়”, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উপাধি হবে “বিদেশমন্ত্রী”। কারণ, আমারা আগে থেকেই অন্য কোন রাষ্ট্রকে “পর” বানাতে পারি না। আমি নিজে সরকারি চাকরি করেছি কোন পররাষ্ট্রে নয়, বিদেশে। আমাদের দেশের কেউ উন্নত চিকিৎসার জন্য পররাষ্ট্রে যান না; যান বিদেশে। আমাদের শ্রমিক ভাইয়েরা কোন পররাষ্ট্রে যান না, যান বিদেশে। আমাদের কেউ পররাষ্ট্রে সেটুল্ড হন না, সেটুল্ড হন বিদেশে।
৭/ “কুটনীতি” শব্দটি শ্রæতিমধুর নয়, “কুট” শব্দটি খারাপ শব্দ; যেমন=কুটকৌশল, কুটবুদ্ধি, ইত্যাদি। তাই, কুটনীতির স্থলে হবে “বিদেশনীতি”।
৮/ আমাদের রাষ্ট্র আছে, দেশ আছে। তাই, কোন ব্যক্তি রাজনীতিবিদ হবেন না, হবেন রাষ্ট্রনীতিবিদ বা দেশনীতিবিদ। রাজনৈতিক কথাটি থাকবে না; থাকবে “রাষ্ট্রনৈতিক” বা “দেশনৈতিক”। রাজনীতি কথাটি থাকবে না; থাকবে “দেশনীতি” বা “রাষ্ট্রনীতি”। কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে/কলেজে আমরা রাজনীতি বা রাজনীতিবিজ্ঞান পড়াই না; পড়াই “রাষ্ট্রবিজ্ঞান” এবং পৌরনীতি।
৯/ ঔপনিবেশিক আমলে কে কবে অনুবাদ করেছেঃ “জেলা প্রশাসক”। বেতন দেয় জনগণ। জনগণের টাকায় বেতন খাইয়া আবার জনগণকে শাসন করবে - এটা কেমন ধৃষ্টতা? তাই, এ পদের নাম হবে “জেলা নির্বাহী কর্মকর্তা”, বা “জেলা সমন্বয়ক”, বা এরকম অন্য কিছু। অধিকন্তু, “জেলা প্রশাসক” নামটি থাকলে দেশের নির্বাচিত সরকারের প্রশাসনের অমর্যাদা হয়; মনে হয়, সরকার যেন দুর্বল বা কুলাতে পারছে না, তাই, অধঃস্থন আরও এক প্রশাসক রেখেছে। অপর পক্ষে, দেশের প্রেসিডেন্ট ছাড়া বাকি সবাই কিন্তু দেশের জনগণের চাকর, অর্থাৎ, জনগণতন্ত্রী বাংলাদেশের চাকর বা সেবক বা সমন্বয়ক বা ব্যবস্থাপক।
১০/ নোবেল বিজয়ী বিশ^নন্দিত ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় স্যারের প্রধান উপদেষ্ট হওয়া মানে তাঁর আরো একটা নোবেল বিজয়। স্যারের জানা আছেঃ মানুষ নমক জীবটি ফেরেশÍÍাও নয়; আবার স্যাটানও নয়। হী ইজ ইন দ্য মিড্ল্। রোহিঙ্গাদের সাহায্যার্থে যা টাকা দেশে এসেছে, তার সবটাই কি ওদের সাহায্যার্থে লেগেছে? ওডিট করেছে কে? অনুরূপভাবে, এখনও রাষ্ট্র সংস্কারের নামে বিদেশ থেকে অনেক টাকা আসার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। সরকার তো সরকারই। অতীতে বিদেশে পাচার হওয়া সকল টাকা দেশে ফিরিয়ে আনা হোক। সৈ¦রাচারবিরোধি বিগত আন্দোলনে যদি এক হাজারজন শহীদ হয়ে থাকেন, এই এক হাজার পরিবারকে শান্তনা-পুনর্ববাসন করা একটা সরকারের পক্ষে মোটেও কঠিন কাজ নয়। একই কথা আহতদের বেলায়ও। তারপর এগুলোর উপরে একটি শে^তপত্র প্রচার করা হোক।
১১/ পাচার হওয়া/লুট হওয়া সব টাকার, ১৬ বছরে সকল হত্যা-গুমের ও ক্ষমতার সকল অপব্যবহারের সঠিক বিচার দ্রæত নিষ্পত্তি করে তার উপযুক্ত শাস্থি নিশ্চিৎ করা হোক এবং এগুলোরও শে^তপত্র প্রকাশ করা হোক। দেশে যারা লুকিয়ে আছে বা যারা বিদেশে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের সকলকে হাশরের ময়দানের মত একত্র করে যথাযত বিচারের মাধ্যমে যত কঠিন শাস্থিই   প্রয়োজন, প্রদান করতে হবে। পুলিশ আর গোয়েন্দা পারে না, এমন কোন কাজ নেই। সকলকে ধরতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্থিরও ব্যবস্থা করতে হবে, সে বা তারা যত বড়ই হোক। প্রয়োজনে দেশে-বিদেশে গড়ে তুলা একাধিক বাড়ি-গাড়ি, ব্যবসা এবং বিনিয়োগ, সব কিছু ক্রোক ও জব্দ করতে হবে এবং তারও শে^তপত্রের প্রয়োজন, যাতে দেশের আপামোর জনসাধারন ও সকল নাগরিক সকল বিষয়ে পরিষ্কারভাবে জানতে পারেন। বাংলাদেশের বর্তমান সকল রাষ্ট্রনৈতিক (অতীতের রাজনৈতিক) দলগুলোকে বলছিঃ এজন্য এ সরকারকে উপযুক্ত ও সম্মানজনক সময় দিতে হবে। মনে রাখবেন, আপনাদের কারো হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা তুলে দেয়ার জন্য এ সরকার আসে নি। আরও মনে রাখবেনঃ আপনারা ১৬ বছরেও যা পারেন নি, ছাত্র-জনতা এক মাসেই তা করিয়ে দেখিয়েছে।  
১২/ রাষ্ট্রনৈতিক হনাহানি চিরতরে বন্ধ করার সুন্দর ও খুব সহজ একটি উপায় আছে; আর, তা হলঃ তৃণমূল ওয়ার্ড-মেম্বার থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত সকল স্তরের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ ২ বার, ৪+৪ মোট ৮ বছর মাত্র। এই ৮ বছর পর সকলেই হয়ে যাবেন ধুম পাবলিক। দেখবেন, পিঠের চামড়া উঠে যাওয়ার ভয়ে আর কেউই দুর্নীতিতে জড়াবে না, স্বজন-প্রীতি, এলাকা-প্রীতি করবে না, সবাই থাকবে “সম্মানিত” অতীত ব্যক্তি এবং অনেকাংশে অভিভাবক হিসেবে। এত বিচার-আচারও লাগবে না। আর, তৎপরবর্তী নির্বাচন হবে অন্তর্বর্তীকালীন বা তত্বাবধায়ক বা তদারকি সরকারের মাধ্যমে। “এখন তো মা-শা-আল্লাহ, আমি আজীবন কন্টেস্ট করতে পারব, ভয় কিসের, গুÐাবাহিনী পালব, তারাই আমাকে প্রত্যেকবার ক্ষমতায় বসাবে, হাঃ হাঃ হাঃ! আমি নিশ্চিন্ত”। এ কারণেই বার বার আসছে পরিবারতন্ত্র, গজাচ্ছে না/জন্ম নিচ্ছে না নতুন নেতৃত্ব, যা জাতির জন্য ক্ষতিকারক ও কলঙ্কজনক। যে-ই একবার ক্ষমতায় আসছে, ভাবছে, ক্ষমতা আমার শুধু পৈত্রিক নয় বরং প্র-পৈত্রিক সম্পত্তি, এবং এর বলি হচ্ছে শিক্ষার্থী ও সাধারন মনুষ। চাকরী বাঁচাতে গিয়ে পুলিশ হয়ে উঠছে দানব, মানহানি হচ্ছে দেশ-প্রেমিক সেনাবাহিনীর, হাল্কা হচ্ছে বিজিবি এবং র‌্যাব। এ সমূহের অবসান প্রয়োজন।

 

লেখক: প্রফেসর ড. মো. আতী উল্লাহ, ইংরেজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা ও ২৪ বছরের বিভাগীয় প্রধান, বিভাগের সাবেক জ্যেষ্ঠতম অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়,   সিলেট, ও দেশে-বিদেশে ৪6 বছরের ইংরেজি ভাষা ও ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক। বর্তমানে ভিজিটিং প্রফেসর, সিলেট সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ সিলেট।