মাননীয় উপদেষ্টাবৃন্দ,
১. ভোট কী জিনিস, দীর্ঘ ১৬/১৭ বছরে ভোটারগণ তা বেমালুম ভুলে গেছেন। ভোটের উপর তাঁদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে মিনিমাম আরো ৪-৫ বছর সময় লাগবে। ভোটের প্রতি তাঁদের ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা প্রশমিত করতে গেলে তাঁদের ব্রেইনওয়াশ করা লাগবে। আর ইতোমধ্যে যারা নতুন করে ভোটার হবেন, তারা এখনো ভোট চিনেই না। সুতরাং, দুই-এক বছরের মধ্যে নির্বাচনের প্রশ্নই উঠতে পারে না।
২. সর্বোপরি, ভোটকেন্দ্রে গিয়ে যারা আগে প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের স্বজনরা ১০০০% নিরাপত্তার গ্যারান্টি না পাওয়া পর্যন্ত আগামী যে কোন নির্বাচনে তাঁরা ভোট দিতে যাবেনই না।
৩. ১৬ বছর পূর্বের আনন্দঘন ভোট-সাইকলোজি জনগনের ভেতরে এখনো জাগ্রতই হয় নি। তাই, রাজনৈতিক দলগুলোর আগামি ভোটে তারা আদৌ যাবেন কিনা, তাতে ৫০০% সন্দেহ রয়েছে। অতএব, হে উপদেষ্টাগণ! কোন একটি বা সকল রাজনৈতিক দলের চাপের কারণে যদি আপনারা দু’য়েক বছরের মধ্যেই ভোটের এরেঞ্জ করেন, তা হলে চলমান ক্রিটিক্যাল মোমেন্টে দুঃসাহস দেখিয়ে আপনারা জাতির যে গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন, তা ১০০০% জলাঞ্জলি দেয়া হবে। আর মনে রাখবেন, রাজনীতিতে কোন কম্প্রোমাইজ হয় না।
৪. কোন বিপ্লবি সরকার কোন শাসনতন্ত্রের মধ্য দিয়ে আসে না, তাই তারা নির্ধারিত কোন সময়ের মধ্যে নির্বাচন দিতে বাধ্য নন। আর কোন পতিত বা পলায়নকারী সরকার কোন শাসনতন্ত্রের ভেতর দিয়ে পতিতও হয় না বা পলায়নও করে না। তাই, এসব ক্ষেত্রে কোন পদত্যাগ বা এ রকম কিছু নিয়ে বাকবিতন্ডারও কোন সুযোগ থাকে না।
৫. গ্রামে যান, গিয়ে জিজ্ঞেস করুন, সকলে বলবে, “আমরা এখন অনেক অনেক ভাল আছি, কোন ভোট চাই না, ভোট দেব কাকে? প্রত্যেকটা দলইতো একই বাক্সের ৬ পিঠের এক এক পিঠ। আমরা তো কোন একটা দলকে কম দেখি নি! আর আমরা কোন দলকে কোন ভোট অনুষ্ঠান করার কোন চাকরীও দেই নি।
৬. হে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার! আপনারা খুব বাজে এবং কঠিন একটা সময়ে দেশের মায়ায় দায়িত্ব নিয়েছেন। কোন একটি দলকে ক্ষমতায় বসাতে আপনারা আসেন নি। অধিকন্তু, আপনারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারও নন।
৭. বৈষম্য-বিরোধী ছাত্র-জনতার রক্তের দাগ এখনো শুকোয়নি, স্বজনহারাদের আহাজারি এখনো শুনা যাচ্ছে, এখনো কেউ কেউ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাচ্ছে, কারো দৃষ্টিশক্তি এখনো ফেরেনি বা জীবনে ফিরবেও না, পঙ্গুত্ববরনকারীরা এখনো কাতরাচ্ছে। আর, এ অবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলোর এত শখ তারা ক্ষমতায় যাবে! এটা তাদের চাকুরি বা পেশা নাকি যে, চাকুরি বাঁচানোর জন্য তারা এত মরিয়া হয়ে উঠবে? পতিত সরকারের উদাহরণ থেকে তাদের শিক্ষা নেয়া উচিৎ। যদি না নেয়, তাহলে তারা জুলাই-আগস্টের বিপ্লবী চেতনাকে ধারণই করে না।
৮. প্লিজ ভুলবেন না, মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা বিশ^বরেণ্য বর্তমানজন না হয়ে যদি অন্য কেউ হত, তাহলে পালিয়ে যাওয়া খুনি-স্বৈরাচারি সরকারকে তার প্রভূরা মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে দেশে ফিরিয়ে এনে আবার তার পুনর্বাসন করত, আর আপনারা প্রত্যেকেই অবশ্যই ধরা খেতেন।
৯. আমি শপথ করে বলছি, ৪-৫ বছর পরও যদি নির্বাচন হয়, তাহলে তখনও যে সরকারই আসবে, ক্ষমতার লোভে ঐ আগের মতই তারা ভারতের তাবেদারি করবে। হয়ত একটু কম বা বেশি! আর, অল্পদিনের মধ্যেই হরতাল-আন্দোলনের নামে নির্বাচিতদেরকে হটিয়ে ওপারের ওরা আবার তাদের পদলেহি সরকারকে ক্ষমতায় বসাবে। আর, সেজন্যই পতিতদের সম্ভাব্য সকল সংগঠন-অঙ্গসংগঠনসমূহকে চিরতরে নিষিদ্ধ করতে হবে, যাতে তারা আর কোন ভবিষ্যতে নির্বাচন করার সুযোগ না পায়। আর, এটা করতেই হবে যদি আপনারা দেশকে ভবিষ্যতের জন্য বাঁচাতে চান।
১০. একজনমাত্র ব্যক্তি ইমেজের কারণে আজ দাদাগিরির মুখ থুবড়ে পড়েছে। এই থুবড়ে পড়াটাকে অন্ততঃ ৫ বছর ধরে রাখতে হবে। ঐ ৫ বছরে ওদের দাদাগিরি না করাটা হয়ত গা-সোয়া হয়ে যাবে।
১১. রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের জন্য যত বেশি চিল্লাবে, ততই বেশি জনপ্রিয়তা হারাবে। কারণ, পাবলিক সবাইকে ভাল করেই চেনে। আজ, না হল কোন সুবিচার, না হল সত্যিকারের কোন সংস্কার; আর নির্বাচন! আর সুবিচার কাকে বলে-রবীন্দ্রনাথের ভাষায় শুনুন:
“দণ্ডিতের সাথে, দণ্ডদাতা কাঁদে,
যবে সমান আঘাতে,
সর্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার”।
১২. আর পাবলিক বোকা না, তারা জানে, নির্বাচনের জন্য চিল্লানেওয়ালাদের মতলবটা কী? তাই এখনই কিসের রোডম্যাপ? কিসের আলোচনা? দেশটা কি কোন রাজনৈতিক দলের একার, না স্রেফ রাজনৈতিক দলগুলোর? দেশের “মোর দ্যান ফিফ্টি পারসেন্ট পিপ্ল আর নট এ্যট অল কন্সার্ণ্ড উইথ পলিটিক্স উই প্রেক্টিজ ইন্ আওয়ার কান্ট্রি”। গ্রামের একজন ওয়ার্ড-মেম্বার গ্রামবাসীকে কি রকম তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, গিয়ে দেখুন না একবার?
১৩. এই দল আর ঐ দল, ১৬ বছরে যা পারে নি, ইয়াং জেনারেশন ধুম পাবলিককে সাথে নিয়ে দু’ মাসে তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে কিভাবে পারতে হয়।
১৪. সবকিছুর একটা মেয়াদ আছে। পাবলিকের ভোটভীতি দুরিভূত করার মেয়াদ ধরলাম আগামী ৫ বছর, যদি ইন শা আল্লাহ দেশ এইভাবে চলে। এর আগে যেই চিল্লাক, তার ব্যবস্থা হবে আইনানুগ।
১৫. সম্মানিত দেশবাসিকে বলছি, আপনারা বর্তমান উপদেষ্টা-কেবিনেটকে সর্বোতভাবে সহযোগিতা করুন।
১৬. মনে রাখবেন, দাদারা পদ্মায় জল দেখে, আমরা কিন্তু পানি দেখি না। এখন ওরা ঘাপটি মেরে বসে আছে, কবে বাংলাদেশে আর একটি মাজাভঙ্গা সরকার আসবে।
১৭. বিগত ১৬ বছরের জঞ্জাল সংস্কার করতে মিনিমাম ৫ বছর লাগবে। পতিতরা দেশের সকল স্তম্ভ ভেঙ্গে দিয়ে পলায়ন করেছে।
১৮. হে সম্মানিত উপদেষ্টা-কেবিনেট! জাতীয় কবি নজরুলের “যৌবনের গান” প্রবন্ধটি সাথে রাখবেন আর সময় পেলেই পড়বেন।
১৯. সংস্কার দৃশ্যমান হবে তখনই, যখন থেকে ১৬ বছরের সুবিচার (বিডিআর হত্যাকাণ্ডসহ) আরম্ভ হবে।
২০. ১৬ বছরের দাগি অপকর্মকারীর সংখ্যা যদি হয় ১০,০০০, তবে তাদের সুবিচার সম্পন্ন করতে ৬ বছরেও হবে না।
২১. একটিমাত্র রায় হোক, দেখবেন, গোটা দেশ বলবে, এই তো সংস্কার আরম্ভ হয়ে গেছে। আরো দেখবেন, সারা বাংলাদেশের কোন মিষ্টির দোকানে সন্ধ্যার পর কোন মিষ্টি মিলছে না।
২২. খোদ আপনাদের কেবিনেটেও কয়েকটি ভূত লুকিয়ে আছে। একজন তো শপথের ৩ দিনের মাথায়ই দাওয়াত দিয়েছিলেন- পালিয়ে যাবেন কেন? দেশে আসুন, নির্বাচনে অংশ নিতে দল গোছান। অন্যদিকে, হায়রে হায়, আফসোস উনার জন্য...........।
২৩. উনি তো আর ইংরেজি সাহিত্য পড়েন নি। তাই আমি সহজে উনাকে দোষারোপও করব না। ইংরেজি সাহিত্য পড়লে দেখতেন, ঐ রকম পালানো সরকার না পালালেও তাদেরকে আজীবনের মত কোন নির্জন দ্বীপে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে। আর, এ কালের নির্বাসন হচ্ছে সাদ্দাম, গাদ্দাফি ও আসাদ। হায়রে গাদ্দাফি! তোমার কবর কোন মরুভূমির কোথায় আছে, ক্বিয়ামত পর্যন্ত একটি কাকও তা বলতে পারবে না। এ্যজ ইফ্, ইংরেজ কবি আলেক্জাণ্ডার পোপেরঃ “নট্ এ্য স্টোন ক্যান টেল, হোয়্যার আই লাই”।
২৪. বিসিএস দিয়ে, ইংরেজিতে ডক্টরট করে, ৪৪-৪৫ বছর দেশে-বিদেশে বিশ^বিদ্যালয় পর্যায়ে একটানা অধ্যাপনা করে আজ মাথায় শুধু প্রতিবাদ আর কটাক্ষই ঘোরপাক খায়। যেমন রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন- “সত্য যে কঠিন, সে কখনো করে না বঞ্চনা”।
২৫. আপনাদের কেবিনেট থেকে (হ্যাঁ, পানি পড়া দিয়েই হোক) ভূত বের করে কেবিনেটকে খাদমুক্ত করুন। একবার শুনলাম- এ বছর কোন অবস্থাতেই ইলিশ পাঠানো হবে না, তবে পর পরই কোন ‘জ¦ীনে’ ধরার ভয়ে এক উপদেষ্টার ওকালতি দেশবাসিকে খুবই মর্মাহত করেছে। এই উপদেষ্টা নিশ্চয় একজন জুজুবুড়ি, সরিষার তেল-পড়া লাগবে উনাকে তাড়ানোর জন্য।
২৬. ৫-৬ বছরে দেশবাসী যখন দেখবেন, হ্যাঁ, সুবিচার-সংস্কার শেষ, তখন উনারাই বলবেন- “এবার নির্বাচন দিন” নয়, বরং “দিতে পারেন”; আর, তখনই হবে রোডম্যাপ, আলোচনা এবং নির্বাচন, কোন রাজনৈতিক দলের চাপে নয়। কারণ, ক্ষমতার লোভে যে কোন রাজনৈতিক দলের খাসলতই হচ্ছে, চাপ দেয়া। তাই, আবার নজরুল:
“বন্ধু গো, বড় বিষজ্বালা এই বুকে,
দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি,
তাই, যাহা আসে কই মুখে।
রক্ত ঝরাতে পারি না তো একা,
তাই লিখে যাই এ রক্ত লেখা,
বড় কথা, বড় ভাব আসে নাকো মাথায়
বন্ধু! বড় দুঃখে,
অমর কাব্য লিখিও তোমরা বন্ধু,
যাহারা আছ সুখে”।
২৭. আমি আবারও বলছি, দেশ কোন রাজনৈতিক দলের একার নয়, এটা একজন ভিক্ষুকেরও জন্মভূমি। তারও একটা ভোট আছে। তার এ অধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ তাকে করে দিয়ে এ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিদায় নেবে। আর, বিদায়ের আগে “দায়মুক্তি” আইন পাশ করে যেতে হবে। কারণ, আইন ও শাসনতন্ত্র দেশের মানুষের জন্য; দেশের মানুষ আইন ও শাসনতন্ত্রের জন্য নয়।
সালাম, আদাব ও কুশল গোটা দেশবাসীর জন্য।
লেখক: প্রফেসর ড. মো. আতী উল্লাহ, ইংরেজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা ও ২৪ বছরের বিভাগীয় প্রধান, বিভাগের সাবেক জ্যেষ্ঠতম অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বর্তমানে ভিজিটিং প্রফেসর, সিলেট সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ সিলেট।




