আদি কালের মিশরীয় ফেরাউন বাদশাহদের রাজত্বের নির্দিষ্ট  সময়-কাল আজও সঠিকভাবে নির্ধারন করা সম্ভব হয় নি। তবে তাদের শাসনামল ছিল সভ্যতার প্রতীক এবং তা ৩০০০ বছর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল ও ফেরাউনদের সংখ্যা ছিল সর্বমোট প্রায় ১৭০ জনের মত।


ঐ সমস্ত ফেরাউনদের শাসন ছিল রাজনৈকি এবং ধর্মিয়। রাজা-বাদশাহগণ বিশ^াস করতেন, তাদের ক্ষমতা ছিল ঐশ^রিক, প্রজা বা মানব-প্রদত্ত নয়। তারা এ-ও মনে করতেন, তাদের প্রজাদের শাসন করার ক্ষমতা তারা দেব-দেবীর নিকট থেকে পেয়ে থাকতেন, অতএব, তারা প্রজাদের কাছে দায়বদ্ধ ছিলেন না, এবং প্রজাদের কাছে তাদের কোন জবাবদিহিতাও ছিল না। তাই তারা এমনিতেই ছিলেন ক্ষমতাধর এবং অত্যাচারি।


এই বাদশাহগণ তাদের নিজ নিজ নেতৃত্বের উপর খুবই আস্থাশীল ছিলেন। আর, প্রত্যেক বাদশাহের একক একক বৈশিষ্ট ছিল। কেহ কেহ নতুন নতুন স্থপত্যে মনোযোগি ছিলেন। কেহ আবার মিলিটারি অভিযানে খ্যাতিমান। আবার কেহ ছিলেন পারদর্শী কুটনীতিক।

নিম্নে ১০ জন ফেরাউন বাদশাহের কীর্তিকলাপের বিবরন তুলে ধরা হলঃ
১. ডিজোসার (রাজত্বকাল, খ্রীষ্টপূর্ব=২৬৮৯-২৬৮৬)।
তিনি ছিলেন মিশরীয় ৩য় বংশের রাজা (উপাধি=ফেরাউন)। তার সম্বন্ধে গবেষণায় খুব বেশি কিছু পাওয়া যায় নি। তবে তিনি মিশরের সাকারা নামক স্থানের পিরামিড নির্মানে তদারকি করেছিলেন। এই পিরামিডেই তাকে সমাধিস্থ করা হয়। এ পিরামিড আজও তার স্থাপত্যশিল্পের বিষেশত্ব বহন করে।

২. ২য় জনের নাম কুফু (রাজত্বকাল খ্রীষ্টপূর্ব ২৬৮৯-২৫২৯)। (আইভরিতে কুফুর খোদাইকৃত ছবি এ্যাল্টিস যাদুঘরে রাখা আছে)

তিনি ফেরাউনদের ৪র্থ বংশের বাদশাহ। তিনি গীযার বড় পিরামিডটি নির্মান করেছিলেন, যা আজও পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের একটি। এটি মিশরীয় একটি আশ্চর্য স্থাপত্য। এটি এতই উঁচু যে, বিগত ৪০০০ বছরেও এটির মত উঁচু স্থাপত্যশৈলী কেউ নির্মান করতে পারে নি। কুফু মনে করতেন, এটি তার স¦র্গে উঠার একটি সিঁড়ি হিসেবে কাজ করবে।

৩. হেটশেপসুট  (রাজত্বকাল=১৪৭৮-১৪৫৮ খ্রীষ্টপূর্ব)
তিনি একজন নারী-ফেরাউন। তার স্বামীর নাম ছিল ঠুতমোজ। তিনি অষ্টাদশ বংশের রাণী ছিলেন।

এই রাণীর বিশ^াস ছিল, তিনি তার মায়ের গর্ভে থাকাকালীনই তার মা ঈশ^রের বার্তা পেয়েছিলেন যে, জন্মের পর এ শিশু রাণী হবে। তিনি বিশেষ করে রাস্ত-ঘাট নির্মানের জন্য এবং শান্তি-স্থাপনের জন্য বিখ্যাত ছিলেন।

৪. ঠুতমোজ (৩য়) (রাজত্বকালঃ ১৪৫৮-১৪২৫ খ্রীষ্টপূর্ব)
তিনি তার স্বীয় সামরিক ট্রেনিং আরম্ভ করেছিলেন, যখন তার সৎ মা ফেরাউন ছিলেন। সৎ মায়ের মৃত্যুর পর ১৪৫৮ খ্রীষ্টপূর্বে তিনি ফেরাউনের মসনদে বসেন। তিনি ছিলেন একজন মিলিটারি জিনিয়াস। তৎকালীন মিশরীয়রা তাকে “মিশরের নেপোলিয়ন” উপাধি দিয়েছিলেন। ফেরাউনদের দুর্গ ও অন্দরমহলের ছবি সমূহ মিশরের যাদুঘরে আজও শুভা পাচ্ছে।

ঠুথমোজ তার জীবনের কোন যুদ্ধে পরাজিত হন নি। তার মিলিটারি সফলতার কারণে প্রজারা তাকে খুব শ্রদ্ধা করতেন, যে সম্মান অন্য কোন বড় ফেরাউনও পান নি।

৫. এ্যমেনহোটেপ (৩য়), রাজতকাল (১৩৮৮-১৩৫১ খ্রীষ্টপূর্ব) 
তার সময়ে মিশরে ছিল শান্তি, হয়েছিল ঈর্ষনীয় উন্নয়ন। তার সাফল্য ছিল সংস্কৃতি ও কুটনীতি। স্থাপত্য ও শিল্পকর্মে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়।

৬. এ্যখেনাতেন, তার রাজতা¦কাল (খ্রীষ্টপূর্ব ১৩৫১-১৩৩৪)
তিনি ছিলেন এ্যমেনহোটেপের পুত্র। তিনি একক ¯্রষ্টায় বা দেবতায় বিশ^াস করতেন। তার দেবতার নাম ছিল এ্যটেন, যার অর্থ ¯্রষ্টার পুত্র। তিনি একটি জনমানবহীন অঞ্চলে তার রাজধানি স্থাপন করেন। তার বিশ^াস ছিল, এই অঞ্চলের একক মালিক ছিলেন তার  দেবতা শুধু এ্যটেনই।
তার স্ত্রীর নাম ছিল নেফারতিতি। তিনিও মিশরের ধর্মীয় বিপ্লবে দক্ষতার সহিত স্বামীর পাশে ছিলেন। তার অনেক শিল্পকর্ম আজও “নিউজ” যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। এ্যখেনাতেনের মৃত্যুর পর মিশর পুনরায় বহু দেবতা-পূজায় চলে যায়।

৭. টিউটানখামুন, (রাজত্বকালঃ ১৩৩২-১৩২৩ খ্রীষ্টপূর্ব)
মিশরের সবচেয়ে কম বয়সি রাজা, যিনি ৯ অথবা ১০ বছর বয়সে ফেরাউনের পদে আসীন হন। কিন্তু তিনি হয়ে গিয়েছিলেন সকল
ফেরাউনদের মধ্যে বিখ্যাত ফেরাউন। তার সমাধি ১৯২২ সালে আবিষকৃত হয়। এই র্ফোঊনের গোল্ডেন ছবিও ঐ সমস্থ যাদুঘরে আজও বিদ্যমান আছে।

৮. রামজেজ (২য়), (রাজত্বকালঃ ১২৭৯-১২১৩ খ্রীষ্টপূর্ব)
তার রাজত্বকাল নিঃসন্দেহে সর্বদীর্ঘ। তিনি ফেরাউনদের ঊনবিংশতম বংশের রাজা। তিনি নিজেকে মানবকূলের ¯্রষ্টা দাবী করেছিলেন ; কিন্তু আকাশ-পাতাল-মহাবিশে^র ¯্রষ্টা দাবি করেন নি। যুদ্ধা হিসেবে তার খ্যাতি ছিল অসামান্য। তিনি রাজত্ব করেছিলেন ৬৭ বছর, জন্ম দিয়েছিলেন ৯৬ জন সন্তান। মহান রামজেজ নামে পরিচিত এই রাজা অত্যন্ত বিনয়ী ছিলেন, এবং এত অধিক খরচ করতেন যে, তার মৃত্যুকালে মিশর আর্থিক দিক থেকে দেউলিয়া হয়ে পড়েছিল।

 ৯. (১ম) জারজেস, (রাজত্বকালঃ ৪৮৬-৪৬৫ খ্রীষ্টপূর্ব)
তিনি ছিলেন ২৭তম বংশের রাজা। তার সময়ে মিশর পারস্য সা¤্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছিল। তিনি পরিচিত হয়ে গিয়েছিলেন পারস্যের ব্যবিচারি রাজা বা সৈ¦রশাসক হিসেবে। তার জনপ্রিয়তা থেকে খ্যাতি ছিল বেশি। তবে তিনি অনুপস্থিত ফেরাউন হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।

১০. ক্লিওপ্যাট্রা (৭ম), (রাজত্বকালঃ ৫১-৩০ খ্রীষ্টপূর্ব)।
তিনি ছিলেন মিশরের খুবই সক্রিয় রাণী। মিশরীয় সা¤্রাজ্যের পতন
অবস্থায়ও তিনি এটিকে মিশরীদের ফেরাউনী সা¤্রাজ্য হিসেবে ধরে রেখেছিলেন। ৩০ খ্রীষ্টপূর্ব সালের ১২ আগষ্ট তিনি আত্মহত্যা করেন। এর সাথেই মিশরীয় ফেরাউনী সা¤্রাজ্যেরও ইতি ঘটে।

কথিত আছে যে, তিনি সাপকেও তার বুকের দুধ পান করিয়েছিলেন, এবং আপন এক ভাইকে বিয়েও করেছিলেন। বিখ্যাত বৃটিশ নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়র “এ্যন্টোনি এ্যÐ ক্লিওপ্যাট্রা” নামে একটি প্রেম-বিরহের নাটকও লিখেছিলেন।
 


লেখক: প্রফেসর ড. মো.আতী উল্লাহ, ইংরেজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা ও ২৪ বছরের বিভাগীয় প্রধান, বিভাগের সাবেক জ্যেষ্ঠতম অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট, ও দেশে-বিদেশে ৪৬ বছরের ইংরেজি ভাষা ও ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক।