ছবি: সিলেট ভিউ।
মৌলভীবাজারের জুড়ীতে এক আঙ্গিনায় জামে মসজিদে নামাজ ও দুর্গামন্দিরে পূজা উদযাপন হচ্ছে। সাম্প্রদায়ীক সম্প্রীতির এ অনন্য নজীর দীর্ঘ ৪৬ বছরের।
উপজেলার সদর জায়ফরনগর ইউনিয়নের ভৈরবগঞ্জ (ভুয়াই) বাজারে পাশাপাশি মসজিদ ও মন্দিরের অবস্থান ও দুই ধর্মের সম্প্রীতির বন্ধন সাধারণের দৃষ্টি কাড়ে ও প্রশংসাকুড়ায়।
জানা যায়, ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে একই সময়ে ভুয়াই বাজারে ভুয়াইবাজার জামে মসজিদ ও শ্রীশ্রী সর্বজনীন দুর্গামন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। মসজিদ ও মন্দিরের দুরত্ব হবে প্রায় ৪০ ফুট। এ এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বসতি কিছুটা বেশী। বছরের অন্যান্য সময় এ মন্দিরে স্বল্প পরিসরে বিভিন্ন পুজানুষ্ঠান পালিত হয়। তবে সনাতন ধর্মালম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা সাড়ম্বরে আয়োজন হয়। মহোৎসবে সপ্তাহব্যাপী চলে পূজার্চনা। অপরদিকে মসজিদে যথা সময়ে যথা নিয়মে পাঁচ ওয়াক্ত আজান দিয়ে নামাজ আদায় করেন মুসল্লীরা। হিন্দু-মুসলীম কেউ কারো ধর্মীয় কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি না করে পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদা বজায় রেখে স্ব স্ব ধর্মকর্ম উদযাপন করছেন।
সাম্প্রদায়িক হানাহানি কিংবা প্রতিহিংসা নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির বন্ধনে চলে পৃথক পৃথক ধর্ম চর্চা। মসজিদে আজানের ৫ মিনিট আগেই বন্ধ করা হয় মন্দিরে ঢাকঢোলসহ বাদ্যযন্ত্র বাজানো। নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হয় সুরের মুর্ছনায় আরাধনা। দীর্ঘ ৪৬ বছর ধরে এক অঙ্গিনায় মসজিদে নামাজ ও মন্দিরে পূজা উদযাপন অসাম্প্রদায়িকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এখানকার মানুষের ধর্মীয় সম্প্রীতি, সামাজিক সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধের নজীর সবার নজর কাড়ে ও প্রশংসা কুড়ায়।
ভুয়াই বাজার জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা সিরাজ উদ্দিন বলেন, বিশ বছর থেকে এই মসজিদে ইমাম হিসেবে আছি। মসজিদে নামাজ হয় যথারীতি আবার মসজিদ ঘেষা মন্দিরে পূজাও হয় তাদের নিয়মে। মন্দির কমিটি প্রতিবছর পূজার আগেই স্ব-উদ্যোগে নামাজের সময়সূচী নিয়ে যান। সে অনুযায়ী নামাজের সময় মাইক বাজানোসহ পূজার সকল কাজ স্থগিত রাখেন। এখানে দুই ধর্মের মানুষের মাঝে যে সম্প্রীতি রয়েছে তা প্রশংসনীয়।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সম্পাদক মো. হাফিজুর রহমান মাসুক বলেন, একে অন্যে সহযোগিতামূলক মনোভাব বিদ্যমান থাকায় ৪৬ বছর ধরে নিজ নিজ ধর্ম পালনে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আমরা চাই এধারা অটুট থাকুক।
শ্রীশ্রী দুর্গামন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি পিযুশ কান্তি দে ও জায়ফরনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রতীশ চন্দ্র দাস বলেন, এখানে একই সময়ে মসজিদ ও মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়ে ৪৬ বছর ধরে পরিচালিত হয়ে আসছে। কেউ কারো ধর্মকর্ম পালনে ব্যাঘাত সৃষ্টি না করে বরং ধৈর্যশীল, শ্রদ্ধাশীল ও সহযোগিতাপ্রবণ মানসিকতা নিয়েই আমরা চলছি। মুসলিম সম্প্রদায়ের কেউই আমাদের ধর্মীয় কার্যক্রমে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি করেন না।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, জুড়ী উপজেলার সদস্য সচিব ডাঃ পিংকু চন্দ্র দাস বলেন, ভুয়াই বাজারে এক আঙ্গিনায় নির্বিঘ্নে মসজিদে নামাজ ও মন্দিরে পূজা হয় তা বিরল এবং উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত । তাছাড়া পুরো জুড়ী উপজেলায় সবার সহযোগিতায় শান্তিপূর্ন ভাবে পূজা উদযাপন হচ্ছে।
জায়ফরনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুম রেজা বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এখানে সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার রয়েছে। সবাই উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে যার যার ধর্মকর্ম পালন করবে। আমরা একে অপরের ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকলেই আমাদের সমাজ সুন্দর থাকবে। মৌলভীবাজার জেলায় ধর্মীয় সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের অন্যতম দৃষ্টান্ত হলো ভুয়াই বাজার। এখানে পাশাপাশি দুই ধর্মের মানুষ প্রফুল্লচিত্তে ধর্মাচার পালন করেন। যা পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্বের সুন্দর উদাহরণ। এ সম্প্রীতি আমাদের ধরে রাখতে হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/মঞ্জুরে/আশিক-২২





